ঢাকা শহর ঘোরার একটা প্ল্যান করলাম। প্রথমে যাবো আগারগাও। সেখান থেকে শাহবাগ পাঠক সমাবেশ। এরপর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বাতিঘর। এরপর বাতিঘরের আশেপাশে লাঞ্চ করে আবার শাহবাগ জাদুঘরে। কারণ অভ্র ওয়েদারে দেখেছে ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত অনেক রোদ থাকবে। তাই এই সময়ে ইনডোরে থাকতে হবে। তারপর এলিফ্যান্ট রোড হয়ে তাবাকে যাবো। তাবাক থেকে লেক ধরে হেটে হেটে যাবো রবীন্দ্র সরোবর। রবীন্দ্র সরোবর থেকে আরেকটু এগিয়ে ইউনিমার্টে এসির বাতাস খেতে খেতে পশ জিনিসপাতি দেখা শেষ করে বেঙ্গল বই। সব শেষে বেঙ্গল বই থেকে সবচেয়ে কাছের মেট্রো স্টেশন ফার্মগেট।
সকালে আমার বের হতে হতে একটু দেরি হয়ে গেল। অভ্রর আগারগাও কাজ হলো না। গোড়ায় গলদ হলেও বাকিসব প্ল্যানমাফিক রাখতে আমরা চললাম পাঠক সমাবেশে। আগারগাও মেট্রো স্টেশনটা অদ্ভুত বলে ঠিক আড়াই সেকেন্ডের জন্য ট্রেন মিস করলাম।
পাঠক সমাবেশে পৌঁছেই অভ্রকে দায়িত্ব দিলাম লাঞ্চের জায়গা বের করতে। অভ্র ম্যাপ খুঁজে খুঁজে রাস্তার ওপার আজিজ মার্কেট থেকে একটা খাটি বাংলা ভাতের হোটেল বের করে ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করলো। এরপর জীবনে বই না পড়া পাবলিক যারা বইয়ের দোকানে কিংবা বইমেলায় গিয়ে অ্যাস্থেটিক ছবি তোলে তাদের মতো আমরা ছবি তোলা শুরু করলাম। ছবি তুলতে তুলতেই অভ্র গীতবিতান কিনে ফেললো। গীতবিতান কিনে আজিজ মার্কেটে ঢুকতেই কথাপ্রকাশের একটা অ্যাস্থেটিক ডিজাইন চোখে পড়লো। এখানে আরেক দফা অ্যাস্থেটিক ছবি তোলার চেষ্টা করে আমরা ভাতের হোটেল খুঁজতে উপরে উঠলাম।
লাঞ্চ শেষে আবার রাস্তা পার হয়ে গেলাম জাদুঘরে। কাল রাতে ম্যাপে দেখেছি আশেপাশের সব জাদুঘর বন্ধ হলেও এটা খোলা। সেই হিসেবে এই জায়গা প্ল্যানে রেখেছি। গিয়ে কয়েকজন বিদেশির মতো আমরাও বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম। আজ জাদুঘর বন্ধ।
জাদুঘরে এসির বাতাস খেতে না পেরে রিকশায় বসে হাওয়া খেতে খেতে বাতিঘর গিয়ে বই দেখলাম। দুইটা বই হাতে নিয়ে বসার জায়গা না পেয়ে ঠিক করলাম তাবাক গিয়ে বসে থাকবো। যেহেতু জাদুঘরে ঘুরতে পারিনি তাই অনেকটা সময় বেঁচে গিয়েছিল, তাবাকে বেশি সময় বসে থাকা যাবে।
বাংলামোটর থেকে জিগাতলা যাওয়ার দায়িত্বটা আরেকবার অভ্রকে দিলাম। তবে এবার সুবিধা করতে পারলো না। এগিয়ে এসে হাতিরপুল থেকে রিকশা নিলাম।
তাবাকে গিয়ে আমি মুগ্ধ। এর আগে একবার গেছি কিন্তু ওইটা বেশ ছোট ছিল। এইটা বেশ খোলামেলা বড় একটা জায়গা। ঠিক দুপুরের পরপর বলে ভীড়টাও অতো জমেনি। তবে যেই সিটটাই পছন্দ হয় ওইখানেই মানুষ বসা। জীবনের সবচাইতে দামী পানীয়টা অর্ডার দিয়ে আবার ছবি তোলা শুরু করলাম।
তাবাক থেকে বের হতে ইচ্ছা করছিল না কিন্তু আজ আর কোথাও না ঘুরলে আবার কবে বের হওয়া হয় তা বলা যায় না। রাস্তা পার হয়ে হাটা শুরু করলাম। হেটে হেটে সরোবর পার হয়ে গেলাম ইউনিমার্ট। এখানে অবশেষে পেলাম অনেকদিন ধরে খুঁজতে থাকা ম্যাংগো সবেহ। এর আগে অবশ্য একদিন ভার্সিটিতে দেখেছিলাম। কিনতে গিয়ে শুনি সেদিনের মতো তাদের বেচাবিক্রি শেষ।
বুকএন্ডসের ইউনিমার্টের কালেকশনটা আমার খুব একটা ভালো লাগে না। তবু এখানকার কয়েকটা বই দেখে আমরা ইউনিমার্ট থেকে বের হলাম। পা আর চলছে না। এরপরের প্ল্যান ইউনিমার্ট থেকে বেঙ্গল বই। রিকশাওয়ালাকে বললাম মীনা বাজার। রিকশাওয়ালা নিয়ে গেল রায়েরবাজার।
বেঙ্গল বইয়ে বসার জন্য জায়গা পেলাম। তবে এসির বাইরে। তাই না বসে আরেকটু ঘুরে দেখি এখানে এক্সিবিশনের ব্যবস্থা করেছে। বেশ কয়েক বছর পর বেঙ্গল বইতে গেলাম। বইপত্র আগের মতো থাকলেও এটা নতুন করেছে। তবে এক্সিবিশনের চাইতেও বড় কথা এখানে বসার জন্য বেঞ্চ আছে, সঙ্গে এসি।
খানিকক্ষণ বসে আমরা আবার ছবি তোলা শুরু করলাম। ছবির সাথে, দেয়ালের সাথে ছবি। অ্যাস্থেটিক ছবি তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে দুজনেই বারবার ব্যর্থ হচ্ছি কারণ আমরা একজনও ঠিক বুঝতে পারছি না কীভাবে দাঁড়াতে হবে বা কোথায় তাকাতে হবে।
বেঙ্গল বই থেকে বেরিয়ে আমরা রিকশা খুঁজতে শুরু করলাম। আমাদের যাত্রা প্রায় শেষ। এবার বাড়ি ফেরার পালা। ফার্মগেট স্টেশন থেকে মেট্রো ধরবো। তারপর সোজা বাসা। এত জায়গায় ঢাকা শহরে একদিনে কোথাও আগে কখনো যাইনি। অবশ্য কখনো চেষ্টাও করিনি। বসবাসের অযোগ্য যেই শহরে কোথাও যেতে হলে রাস্তায় বসেই অর্ধেক যাত্রার ইতি টানতে হয় সেখানে একদিনে কোন কাজ ছাড়া শুধু ঘুরে বেড়ানোর জন্য এত জায়গায় যাওয়ার কথা কার মাথায় আসে!