অসময়ের ঘন্টা

0 Shares
0
0
0

ফিল্ম ডাইরেক্টর ঝটকু মিয়া বারান্দায় বসে আছেন।

সবে ভোর হচ্ছে। বাইরে মৃদুমন্দ শীতল বাতাস বয়ে যাচ্ছে। আশেপাশে জেগে ওঠা শহরের কোলাহল নেই। বেশ শান্ত স্নিগ্ধ একটা সকাল। এরকম সুন্দর প্রশান্তিময় সকালেও ঝটকু মিয়ার চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। কিছুক্ষণ আগে হতচ্ছাড়া অ্যালার্মের শব্দে তার ঘুম ভেঙেছে। অ্যালার্ম বন্ধ করে আবার ঘুমানোর বৃথা প্রচেষ্টা চালিয়ে তিনি বারান্দায় এসে বসেছেন কিছুক্ষণ হলো। চোখেমুখে ঘুম আর রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে তিনি পরপর দুইবার হাই তুললেন।

দিনকাল তার সুবিধার যাচ্ছে না। এই শুক্রবারের দিন এত ভোরে ঘুম ভাঙা তার একটা নমুনা। নমুনা হিসেবে ছোট, তবে অবস্থা বোঝাতে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ঝিমুতে ঝিমুতে ঝটকু মিয়া ভাবতে শুরু করলেন আজকের অ্যালার্মটা তিনি দিলেন কখন।

ভেবে তিনি বিশেষ সুবিধা করতে পারলেন না। পারবেন না জানতেন। তবু একবার চেষ্টা করে দেখা আরকি। দিনটাই শুরু হয়েছে বৃথা প্রচেষ্টা দিয়ে। সারাদিন কি কি অপেক্ষা করছে কে জানে। হঠাৎ এসএসসি পরীক্ষার আগে মুখস্থ করা একমাত্র ভাবসম্প্রসারণের কথা তার মনে পড়লো- “মেঘ দেখে কেউ করিস নে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে”। এই একটিমাত্র ভাবসম্প্রসারণকে ভরসা করে তিনি বাংলা দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলেন। পরীক্ষায় এসেছিলো “শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড”। হাড় বাদ দিয়ে শিক্ষাকে মেরুদন্ড হিসেবে নির্বাচন করা যে এক নম্বরের অশিক্ষা- মনের মাধুরি মিশিয়ে অনেক কথার সঙ্গে এ কথাও তিনি লিখেছিলেন। কথা হিসেবে যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু শিক্ষকের মন ওতে ভিজবে নাকি এ ব্যাপারে ঝটকু মিয়ার মনে দ্বিধা ছিল। মন না ভিজুক, অন্তত মনে যদি দয়া হয় তবে এ যাত্রায় পার করিয়ে দেবেন এই আশায় বুক বেধে তিন মাস পার করেছিলেন।

ভাবসম্প্রসারণের কথা মনে পড়তেই ঝটকু মিয়া আবার আশাবাদী হলেন। দিনটা আজ ভালো যাবে এই আশায় তিন মাস না হোক- এই সকালটা কাটিয়ে দেয়াই যায়। ‘অসময়ের ঘন্টা’ নামক ইউটিউব চ্যানেলে আজকে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার দেয়ার কথা রয়েছে। দেশের সিনেমা হলে প্রতিবেশী দেশের (অপসংস্কৃতিমূলক) সিনেমা মুক্তি নিয়ে কথা বলতে হবে। কথা অবশ্য তিনি বলবেনই। সঙ্গে তেজী বাক্যের হুংকারে বিদেশী অপসংস্কৃতিকে দেশছাড়া এই সাক্ষাৎকারেই করবেন বলে মনে মনে ঠিক করলেন।

দুইদিন পরপর প্রতিবেশী দেশের সিনেমা মুক্তি নিয়ে হইহই রইরই শুরু হয়। কিন্তু তার এবং তারমতো কতজন দেশপ্রেমিক চলচ্চিত্রকর্মীর তীব্র প্রতিবাদের জন্য বর্ডারের কাটাতার পেরিয়ে দেশের বেঁচে থাকা চল্লিশ-পঞ্চাশটা সিনেমা হলে আর পৌঁছাতে পারে না। খালি মাঠে গোল দিয়ে তাই ফাঁকা হলে চলতে থাকে ঝটকু মিয়ার বন্ধু লেবু মিয়ার সিনেমা ‘কসাই যখন অপরাধী’।

ঝটকু মিয়া শেষ কবে সিনেমা বানিয়েছেন তা তিনি নিজেও মনে করতে পারেন না। তবু দেশের সিনেমার এই ক্রান্তিকালে মশাল না হলেও ভুল বানানে বানানো ব্যানার হাতে রাজপথে সবার আগে তাকেই দেখা যায়। অনেকদিন ছবি না বানালেও জং ধরা হাতে খুব শীঘ্রই তিনি নতুন চলচ্চিত্র জাতিকে উপহার দিতে চলেছেন। নামও ঠিক করে ফেলেছেন। ‘অদ্ভুত প্রেম উদ্ভট ভালোবাসা’। এক নায়ক দুই নায়িকার কাহিনী। কাহিনী অবশ্য সম্পূর্ণ মৌলিক। এমন গল্প কেউ আগে কল্পনাতেও ভাবেনি কাজেই মৌলিক না হয়ে যায় কোথায়। তিনটে তামিল আর দুটো তেলেগু সিনেমা থেকে মিক্সিং করে বানানো গল্প। একদম অরিজিনাল। নায়ক নায়িকাও চূড়ান্ত হয়ে গেছে। দুই নায়িকার একজন আবার নতুন টিকটক স্টার।

প্রতিবেশী দেশের আবার ভাষার অভাব নেই। আজ এক ভাষার সিনেমা আসতে যাচ্ছে। কাল আরও দুইটা আসবে। এভাবে যদি সব চলে আসে তবে ঝটকু মিয়া ইউনিক গল্পে ফাঁকা হলে ছবি চালাবে কীভাবে? দর্শকের যদি এতই অপসংস্কৃতি দেখতে ইচ্ছা করে তো টিভিতে দেখুক, ইন্টারনেটে দেখুক। তিনি নিজেও তো প্রতিদিন একটা করে হিন্দি সিনেমা দেখেন। কই, তার তো অসুবিধা হয় না। তাহলে দর্শকের কেন হলে গিয়েই দেখতে হবে? ভাবতেই ঝটকু মিয়ার তেজ বেড়ে গেল। এক্ষুনি ‘অসময়ের ঘন্টা’ বেজে গেলে ভালো হতো। বেশ জ্বালাময়ী একটা বক্তৃতা দিয়ে ফেলা যেতো। কে জানে, ঝটকু মিয়ার ঝটকাতে এবারও হয়তো অপসংস্কৃতিকে কাটাতারের ওপারেই পড়ে থাকতে হতো, ঠিক যেরকম পড়ে থাকে পথের শিশুরা, ভিন্ন এক জীবন-সীমানার ঠিক পাশে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You May Also Like

ইস্টিশন

ইমা কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছালো দৌড়াতে দৌড়াতে। ট্রেন ছাড়ার কথা দুপুর একটায়। এখন বাজে দুইটা সাত। সকাল থেকে একটু…
Read More

চোরের গপ্পো

‘জাতি হিসেবে আমরা গবেট।’ঝাঁঝ মেশানো গলায় আফজাল ভাই কথাটা বললেন। শুনেই বুঝে গেলাম আজ বিরাট লেকচার হবে। আফজাল…
Read More

মেঘফুল

বাইরে রোদ ঝলমল করছে। অথচ আজ সারাটা দিন সূর্য ছিল মেঘের আড়ালে। সেই ভোরবেলায় বৃষ্টি নামার পর আর…
Read More