সেমিস্টার ব্রেকের এক সপ্তাহ হয়ে গেছে। শুয়ে বসে সুন্দর ছুটি কাটাচ্ছি। সমস্যা হচ্ছে ঘুম নিয়ে। প্রতিদিন ভাবি আরাম করে একটু দুপুর পর্যন্ত ঘুমাবো, কিন্তু যেহেতু এখন কোন কাজকর্ম নাই তাই একা একাই ভোরবেলা ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম ভাঙলেও বিছানা ছাড়ি না। রাজ্যের আলস্য নিয়ে শুয়ে থাকি। উঠি ঘন্টা খানেক পর।
১
উঠে জানালার পর্দা সরাচ্ছি, হঠাৎ ভাই এসে বললো, ‘কক্সবাজার যাবি?’
কক্সবাজার আমার পছন্দের জায়গা না। ছবিতে, টিভিতে, সিনেমাতে, নাটকে অনেক দেখেছি। শুধু পানি দেখা এমন কি হতে পারে বুঝি না। তবু সঙ্গে সঙ্গে বললাম, ‘এক পায়ে খাড়া।’
আমি আসলেই এক পায়ে খাড়া। কারণ প্রথমবারের মতো ঢাকার বাইরে যাওয়া হবে। আমার ক্লাসের নিরানব্বই জন ঢাকার বাইরে গেছে। শুধু একজন যায় নাই। সেই একজনের নাম ইশতিয়াক।
এক পায়ে খাড়া হওয়ার আরেকটা কারণ হচ্ছে, জীবনে এই প্রথম একটা সত্যিকারের ট্যুর হবে। ইউনিভার্সিটিতে আর সবাই কত্ত জায়গায় যায়। অবশ্য এর আগের সেমিস্টার ব্রেকে আমিও গিয়েছিলাম। ট্যুরের লোকেশন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। সে আরেক কাহিনী। আগ্রহী কেউ সেই কাহিনী শুনতে চাইলে জারিন নুদার খানের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।
যাইহোক, জিজ্ঞেস করলাম, ‘কবে যাবি?’
‘কাল পরশু।’
আমি অবাক। বলে কি! একদিনের নোটিশে এ আবার কেমন ট্যুর। প্রথমবারের মতো এতদূর যাবো একটা প্রিপারেশনের ব্যাপারও তো আছে।
‘কেম্নে যাবি?’
‘কেম্নে যাইতে চাস?’
আজীবনের শখ ট্রেনে চড়ার। কখনো ঢাকার বাইরে যাওয়া হয়নি বলে ট্রেনেও ওঠা হয়নি। এবার শখ পূরণের সুযোগ এলো। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ট্রেনে গেলে নাকি অনেক সময় লাগবে।
এতটুকু কথা বলে ভাই সারাদিনের জন্য ঘুমাতে গেল। আমি এদিকে বন্ধুবান্ধবদের কাছে ঘোষণা দিলাম, ট্যুর দিচ্ছি। ডেস্টিনেশন কক্সবাজার।
ট্যুর দেয়ার কথা আমি প্রায়ই বলি। মিরপুর টু ধানমন্ডি বা মিরপুর টু বনানীও আমার কাছে ট্যুর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আলসেমি লাগে বলে আর বাসা থেকে বের হওয়া হয় না। তাছাড়া সিলেট ট্যুরের কথাও অনেকদিন ধরে বলে আসছিলাম। এবার তো মোটামুটি ঠিক করেই ফেলেছিলাম কিন্তু বন্যার জন্য আর যাওয়া হলো না। (বন্যা না থাকলেও যে খুব যাওয়া হতো এমনটা না। কিন্তু বন্যার জন্যই আসলে এবার সিলেট ট্যুরটা হলো না।)
ভেবেছিলাম আমার কক্সবাজার ট্যুরের খবর শুনে সবাই হতবাক হয়ে যাবে। অনেকক্ষণ পর নিজেদের সামলে তারপর কথা বলবে। ওমা! দেখি প্রায় সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই এলো, ‘আগে যাইয়া নে।’
২
যেহেতু ভোরে ঘুম ভেঙে যায় সেহেতু দিনে ঘুম পায়। কাজকর্ম নাই তাই ঘুম পেলে ঘুমিয়ে যাই। বড়ই আরামের দিন তখন।
ঘুম থেকে ওঠার পর ভাইয়ের সঙ্গে আবার দেখা হলো সন্ধ্যাবেলা। শুনি, ট্রেনের টিকেট কাটা শেষ। পরদিন রাত সাড়ে এগারোটায় ট্রেন। যাত্রা হবে দুই দফায়। প্রথমে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ট্রেনে, এরপর বাসে কক্সবাজার।
খবরটা বন্ধুদের বললাম। আমি যে আসলেই যাচ্ছি এটা ওরা এখনো ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না। অভ্র অবশ্য বললো, ‘যাক, হাবড়ার পুলখানা অবশেষে পার হচ্ছো।’
ট্রেন দিনে না রাতে সেটা বলা হয়নি। তাই পরদিন সকাল এগারোটায় মেসেজ এলো, ‘কোথায়?’
আমি বললাম, ‘বিছানায়।’
ফোনের স্ক্রিনে কথা হচ্ছে। তবু আমি ওইপাশের অট্টহাসি শুনতে পেলাম। তখন গম্ভীর গলায় (আফসোস, টেক্সটে গম্ভীর গলা বোঝা যায় না। ভয়েস মেসেজ পাঠানো উচিত ছিল। মিস্টেক) বললাম ট্রেন ‘রাত’ সাড়ে এগারোটায়।
৩
বাসার সামনে থেকে সিএনজি নিলাম। ভাই বললো, ‘তুই ঠিক কর। ভাড়া তিনশ টাকা।’
দেখতে চায় আমি সিএনজি ভাড়া করতে পারি নাকি। জীবনে যেন আর ভাড়া করি নাই। যাইহোক, কমলাপুর স্টেশনে যখন পৌঁছালাম তখনো হাতে অনেক সময়। এর আগে কখনো স্টেশনে আসি নাই। ভাই ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালো কোথায় কী আছে। কাউন্টারে গিয়ে দেখলাম দুই আড়াই হাজার টাকায় কলকাতা যাওয়া যায়!
ট্রেন আসতে অনেক দেরি, ‘বিশ্রামকক্ষে’ গিয়ে বসলাম। মেসেঞ্জারে ঢুকে শুনলাম রাতের ট্রেনে বাচ্চারা নাকি অনেক কান্নাকাটি করে। কথাটা প্রমাণ করে দিতেই নাকি কে জানে পাশ থেকে একটা বাচ্চা কান্না শুরু করলো (তবে শেষ পর্যন্ত আমাদের বগিতে কোন বাচ্চা ছিল না, থাকলেও কাঁদেনি, কাঁদলেও সমস্যা হয়নি)।
ট্রেন ছাড়ার অল্প কিছুক্ষণ আগে আমরা বের হলাম। এরপর হাটছি তো হাটছিই, ট্রেন এত লম্বা হয়! আরো হাটার পরে আমাদের বগি পেলাম। ঘড়ির কাটা সাড়ে এগারোটা পেরিয়ে যাবার অনেক পরে ট্রেন ছাড়লো। প্রথমে ধীরেধীরে। এরপর গতি একটু বাড়লো। তারপর আরো একটু বাড়লো।
এসি কামড়া। জানালা বন্ধ। ট্রেনের ঝিকঝিক শব্দ ম্লান হয়ে ভেসে আসছে। রাতের অন্ধকারে বাইরে তাকালে জানলার কাচে নিজেকে ছাড়া আর যা দেখা যায় সেটা হচ্ছে বগির প্রতিবিম্ব। ট্রেনে আছি আলাদা করে বলে না দিলে বোঝা মুশকিল। আমি ঘুমানোর প্রস্তুতি নিলাম। মুখের মাস্কটা চোখে দিয়ে পাশের সারির এক ভদ্রলোকও আমার সঙ্গে ঘুমের প্রস্তুতি নিলো।
৪
ঘুম ভাঙলো ঠান্ডা বাতাসে। মাথার উপর ফ্যান ঘুরছে। পুরো বগিতে এই একটা ফ্যানই চলছে। ট্রেনে ওঠার পর চালিয়েছিলাম। আর বন্ধ করা হয়নি।
ঘড়ি দেখলাম। দুইটার মতো বাজে। ট্রেন ছুটে চলেছে। তবে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। জানলা দিয়ে বাইরে দেখার চেষ্টা করলাম। কালো কাচে আমার চেহারা ছাড়া আর কিছু দেখা গেল না। ম্যাপ বের করে ধাক্কা খেলাম। এখনো ঢাকা থেকে বেশি দূরে আসিনি। পৌঁছাতে কতক্ষণ লাগবে কে জানে।
পাশের লোকটা মাস্ক দিয়ে চোখ ঢেকে দিব্বি ঘুম দিচ্ছে। আমিও ঘুমালাম। আবার ঘুম ভাঙলো ফেনী আসার পর। তখন ভোর রাত। রাতভর গাড়িতে এর আগে কখনো থাকিনি। অবশ্য বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকে যা হচ্ছে আর হবে তার প্রায় সবই নতুন অভিজ্ঞতা।
আমার ট্রেনে চড়ার শখ মিটিয়ে ট্রেন যখন চট্টগ্রামের কাছাকাছি চলে এসেছে তখন আমার ঘুম আবার ভাঙলো। বাইরে ভোরের আলো। কামরার অনেকে ঘুমাচ্ছে। অনেক সিট ফাকা হয়ে গেছে। আরো একটু পরে ট্রেনের গতি কমতে শুরু করলো। আমরা চট্টগ্রাম চলে এসেছি।
৫
ভোরবেলা ট্রেন থেকে নামলাম। আশেপাশে মানুষ বেশি নেই। আমি ছবি তুলতে দাঁড়িয়ে গেলাম। ঢাকার বাইরে আসা প্রথম শহর বলে কথা!
প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে স্টেশনের ভিতরে গেলাম। আগে থেকে না জানলে বুঝতেই পারতাম না এটা স্টেশন। সারাজীবন এক কমলাপুরের ছবি ভিডিও দেখে এসেছি। রেলস্টেশন বলতে আমার মাথায় কমলাপুরের গোল বেদির ভেসে ওঠে। সে যাইহোক, সকালের নাস্তা খেতে হবে এখন। আমার অবশ্য খাওয়ার তেমন ইচ্ছা ছিল না (বেশিরভাগ সময়ই থাকে না)।
সারা রাস্তা ঘুমিয়েও ঘুমঘুম ভাব কাটেনি। বেশি কিছু খাবো না। ঘুম কাটানোর জন্য চা আর সঙ্গে অন্য কিছু একটা হলেই হয়ে যাবে। ভাইয়ের তাতে চলবে না। ওর লাগবে ডাল পরোটা ভাজি…। অন্য সময় হলে আমিও খেতাম। কিন্তু এখন একে তো খেতে ইচ্ছা করছে না তারমধ্যে এই নতুন জায়গার ডাল ভাজি কেমন হবে সেটাও একটা কথা। এই জিনিস মনের মতো না হলে এত্ত বিরক্ত লাগে!
ভাইও ঠিক করলো আমি যা খাবো তাই খাবে। স্টেশনেরই একটা দোকান থেকে দুধ চা আর রোল অর্ডার দিলাম। চায়ের চেহারা দেখেই খাওয়ার ইচ্ছের চলে গেল। দেখে প্রথমে ভেবেছিলাম রঙ চা। রঙ চা যেভাবে দেয় ঠিক ওভাবেই এনেছে। পার্থক্য হচ্ছে এখানে গরম পানিতে একটুখানি গুড়া দুধ দেয়া।
আমি গরম চা খেতে পারি না। জুড়িয়ে এলে চায়ে চুমুক দিলাম। আমার জীবনে খাওয়া সবচেয়ে বিচ্ছিরি চায়ের তালিকায় এই জিনিস এক নাম্বারে থাকবে এ কথা নিশ্চিত হয়ে গেলাম। রোলে একটা কামড় দিলাম। সবচেয়ে বিচ্ছিরি রোলের তালিকাতেও এই জিনিস এক নাম্বার বা তার আশেপাশেই থাকবে। ভাই বিস্কুট কিনে দোকান থেকে বের হলো।
স্টেশন থেকে বের হয়েই সিএনজি নিলাম। এখন যাবো বাসস্ট্যান্ডে। ট্রেন বাস সিএনজি- আধা ঘন্টার মধ্যে তিন বাহনে চড়ে ফেললাম!
সিএনজিতে চট্টগ্রামের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি। দুই পাশের বিল্ডিং দেখে নিউমার্কেট এরিয়ার কথা মনে পড়ছে। নামধাম ঢেকে কিঞ্চিৎ এডিট করে এলাকাটাকে গাউছিয়া মার্কেট বলে সহজেই চালিয়ে দেয়া যাবে।
বাসস্ট্যান্ডে নেমে সিএনজি থেকে বের হওয়ার আগেই বাস থেকে ডাকাডাকি শুরু হয়ে গেলো। এরকম ডাকাডাকি কাল রাতে কমলাপুর স্টেশনে নেমেছি পরে একবার ডেকেছিলাম। আমরা অবশ্য ডাকে সাড়া দিলাম না। ইউটিউব থেকে খোঁজ নিয়ে এসেছি। ওই বাসের কাউন্টারে গিয়ে বসতে না বসতেই বাস চলে এলো।
এরকম বাসে এর আগে কখনো উঠেছি বলে মনে পড়ে না। অবশ্য উঠে যাবোই বা কোথায়। সিট আবার বাকানোও যায়!
একটু পরেই বাস একটা ব্রিজে উঠলো। নিচে বিশাল নদী আর নদীতে জাহাজ। সত্যিকারের জাহাজ! অ্যাভেঞ্জারস এজ অব আল্ট্রনের সেই জাহাজ! জাহাজ অবশ্য এর আগেও দেখেছি। তবে জলে নয়, স্থলে। ছোটবেলায় একবার মৈনট ঘাটে গিয়ে জাহাজ বানানোর ফ্যাক্টরি (ওটাকে কি ফ্যাক্টরি বলা যায়?) দেখেছিলাম। মেরামত করছে, নতুন বানাচ্ছে…ছোট আমি অবাক হয়ে ভাবলাম, এখান থেকে এত বড় জাহাজ পানিতে নামাবে কীভাবে!
যাইহোক, জাহাজ দেখে ভাবলাম সমুদ্রের কাছে মনে হয় চলে এসেছি। আমি তখনো জানি না, কক্সবাজার যাওয়া মাত্র শুরু হলো আর যেই নদীর ওপর দিয়ে যাচ্ছি সেটা আসলে কর্ণফুলী নদী! কর্ণফুলী নদীর ব্যাপারটা অবশ্য জেনেছি বাসায় চলে আসারও বেশ কয়েকদিন পর। ফেসবুকে হঠাৎ একটা ছবিতে দেখি সেই একই নদী, একই ব্রিজ, একই জাহাজ। ক্যাপশনে লেখা কর্ণফুলী ব্রিজ।
এই কর্ণফুলী ব্রিজ পার হয়ে আরো অনেকদূর চলে গেলাম। রাস্তার পাশে পাহাড় শুরু হলো। বেশিরভাগ সময়ই অবশ্য পাহাড় মনে হতো না। বড় বড় গাছপালার জঙ্গলের মতো লাগতো। এই রাস্তা দিয়ে বাস ছুটে যাচ্ছে। এদিকে আমার ফোনের চার্জ ফুরিয়ে এসেছে। যতই ভাবছি কাছাকাছি চলে আসছি ততই দেখি রাস্তা আরো বহুদূর। ভাই যেহেতু আগে কয়েকবার এসেছে তাই বারবার জিজ্ঞেস করলাম, কতক্ষণ লাগবে। বললো, দুই ঘন্টা, এক ঘন্টা, বেশিদূর না। রাস্তা তখনো তিন ঘন্টার বাকি!
করার কিছু নেই। সারারাত ট্রেনে ঘুমিয়েও আবার ঘুমালাম। ঘুম অবশ্য ভালো হলো না। মাঝেমাঝেই তাকিয়ে সবকিছু দেখতাম। কক্সবাজার পৌঁছে গেছি, অমুক জায়গা, তমুক জায়গা, স্কুল, বাজার আর পাহাড়। কিন্তু সমুদ্র নেই। হঠাৎ একটা রাস্তার মাঝখানে বাস থেমে গেলো। আমরা পৌঁছে গেছি। বাস থেকে নেমে চারপাশ দেখলাম। আক্ষরিক অর্থেই রাস্তার মাঝখানে নামিয়ে দিয়েছে! পিছনেই ব্রিজ দেখা যাচ্ছে। সাই সাই করে গাড়ি যাচ্ছে। এমন জায়গায় বাস থামিয়ে যাত্রী নামাতে পারে!
আমরা হাটতে শুরু করলাম। একটু এগিয়ে থামলাম। ভাই বললো, ‘এইটা হচ্ছে ডলফিন মোড়।’