সময়টা ঊনবিংশ শতাব্দী, আরো নির্দিষ্ট করে বললে ১৮১৫। নেপোলিয়নের সঙ্গে ব্রিটিশরা যুদ্ধ করছে। এক ধনকুবের এই যুদ্ধে টাকা-পয়সা দিয়ে ব্রিটিশদের সাহায্য করছে। এই লোকের ধনকুবের হওয়ার কাহিনীটা ছোট্ট করে বলে ফেলি।
তখনকার দিনে একটু ভালো ফ্যামিলির বাচ্চাদের ল্যাটিন আর গ্রিক শেখানো হতো। কিন্তু এই ধনকুবেরের বাবা ছিল ব্যবসায়ী। ব্যবসায় বেশ ভালো করা এই বাবা ঠিক করলেন তার ছেলের ল্যাটিন গ্রিক শিখে কাজ নেই কিছু বাস্তব কাজ শিখুক। তার ১৪ বছরের ছেলেকে তিনি পাঠালেন স্টক মার্কেটে কাজ শিখতে। ছেলে কাজ ভালোই শিখলো। শিখে টাকাপয়সাও ভালোই ইনকাম করলো। সেই ছেলেটাই আমাদের ধনকুবের।
আগের বছরই তিনি পাঁচ হাজার একর জমি কিনেছেন। সেখান থেকে অঢেল টাকাপয়সা আসছে। কিন্তু যুদ্ধ যেহেতু চলছে ভয় তো একটা আছেই। যতই জমি থাকুক আর টাকা পয়সা হোক, ব্রিটিশদের যে সাহায্য করছেন, যুদ্ধে হেরে গেলে কানাকড়িও যে ফেরত আসবে না সে কথা তার ভালোই জানা আছে। শুধু তার না, তার এক বন্ধুরও জানা আছে।
সেই বন্ধুও কিছু টাকা ধার ব্রিটিশদের দিয়েছিলো। ধনকুবেরের মতো অত না, সাহসে কুলায় না বলে অল্পকিছু। তবে যুদ্ধের এক পর্যায়ে ‘দোস্ত আমার ভয় লাগতেসে’ বলে বন্ধু যখন প্যানিক করা শুরু করলো তখন আমাদের ধনকুবের মাথা ঠান্ডা রেখে ‘আরে ব্যাটা দাড়া। দেখি কি হয়’ বলে ওয়াটারলু যুদ্ধ দেখতে লাগলো। যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত জয় হলো ব্রিটিশদেরই আর এই ধনকুবের রাতারাতি আরো বড়লোক হয়ে গেল।
এই ধনকুবের একদিন লাইব্রেরিতে গিয়ে একটা বই পায়। বইয়ের নাম ‘The Wealth of Nations’, লেখক Adam Smith. বইটা পড়ে তো ধনকুবেরের মাথায় হাত, ‘কি জিনিস পড়লাম ভাইরে ভাই’। এই বই পড়ে তিনি ইকোনমি অ্যানালাইসিস করতে বসে গেলেন। কীভাবে দেশের সম্পদ তার মতো জমিদার, ক্যাপিটালিস্ট আর যারা কাজ করে- শ্রমিক তাদের মধ্যে ভাগ হয়। তখন আবার জমিদার আর ক্যাপিটালিস্টদের মধ্যে একটা কম্পিটিশন চলছিলো।
এই ধনকুবের একদিন হয়ে গেলেন এমপি। তখন অন্য দেশ থেকে খাবারদাবার আমদানি ব্রিটেনে নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু এদিকে নিজ দেশে খাবারের দামও নাগালের বাইরে। মানুষ তবে খাবে কী? দেশজুড়ে চিন্তা, নানান জনের নানান মত। কিন্তু লাভের লাভ কিছু হচ্ছে না। আমাদের সেই বড়লোক এমপি সহজ সমাধান নিয়ে এলেন। বললেন, ‘যেই দেশে শস্য ভালো হয় সেখান থেকে কিনে আনলেই ঝামেলা মিটে যায়।’ কিন্তু অন্যরা সবাই মুখ বাকিয়ে বললো, ‘এহ আসছে আমার বিরাট অর্থনীতিবিদ!’
আমাদের এই বড়লোক ধনকুবের অর্থনীতিবিদ এমপি মহোদয়ের লজিক ছিল দুই দেশের একটা যদি দুইটা প্রোডাক্টই ভালো বানাতে পারে তবু ট্রেড করলে দুই দেশেরই লাভ হবে। কারণ এক দেশ হয়তো একটা প্রোডাক্ট আরেকটার চাইতে ‘বেশি ভালো’ বানাতে পারে। এখন যেটা ভালো বানাতে পারে সেটাই যদি বেশি বানিয়ে বেশি বিক্রি করে অন্য দেশ থেকে আরেকটা প্রোডাক্ট কিনে আনে আর ওই দেশও যদি একইভাবে কেনাবেচা করে তাহলে তো দুই পক্ষেরই লাভ।
তবে হ্যাঁ, এতে কিছুটা ক্ষতি অবশ্য জমিদারদের হবে কারণ তারা আর আগের মতো চড়া দামে জমি ধার দিতে পারবে না। তবু জনগণের যে এতে লাভ হবে তাতে সন্দেহ নেই।
এখানে একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না আমাদের ধনকুবের অর্থনীতিবিদ এমপি নিজেও কিন্তু এক জমিদার ছিলেন। ১৮১৪ সালে ৫০০০ একর জমি কিনেছিলেন তিনি। যদি তার কথামতো শস্য আমদানির নিষেধাজ্ঞা বাতিল করা হয় তাহলে তারও কিন্তু ভালোই লস হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তবু তিনি বাতিলের পক্ষেই তর্ক-বির্তক করে গেছেন কারণ তার অর্থনৈতিক জ্ঞান বাতিলকেই সঠিক বলে রায় দিয়েছিলো। আমাদের এই ধনী এমপি অর্থনীতিবিদের নাম David Ricardo.
(যুদ্ধের সময় প্যানিক করা সেই বন্ধুটি নিজেও একজন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ। তার নাম Thomas Malthus. তাকে বলা হয় জনসংখ্যা বিজ্ঞানের জনক।)