Image by Freepik

ম্যাক্রো মানে বড়: যেভাবে এলো ম্যাক্রোইকোনমিকস

0 Shares
0
0
0

“তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকলো।” এই বাক্যটা আমাদের খুব পরিচিত। প্রায় সব রূপকথার গল্পের শেষ হয় এই বাক্য দিয়ে। সুখে শান্তিতে বাস করার পর রূপকথায় কি হয় সেটা আমাদের জানা নেই। তবে বাস্তব জীবনে কি হতে পারে সেটার ছোট্ট একটা উদাহরণ হিসেবে ত্রিশের দশকে ঘটে যাওয়া ‘দ্যা গ্রেট ডিপ্রেশন’ এর কথা বলা যেতেই পারে।
১৯২০ এর দশককে রূপকথার সেই ‘সুখে শান্তিতে বসবাস করার’ সময় বলা যেতে পারে। কারণ তখন অর্থনীতি ছিল বেশ স্থিতিশীল। অর্থনীতিতে ছিল পর্যাপ্ত চাকরি, ইনকাম এবং স্থির মূল্যস্তর (Stable price level)। ১৯২০ থেকে ২৮ সাল পর্যন্ত সবাই এক রকম সুখে শান্তিতে বাস করলেও বাস্তব যেহেতু রূপকথার মতো না তাই ১৯২৯ সালের অক্টোবর মাসে ঘটে যাওয়া আমেরিকার স্টক মার্কেটে ধ্বস থেকেই আমরা দেখতে শুরু করি বাস্তব জীবনে ‘সুখে শান্তিতে বসবাস করার’ পর কি হতে পারে। এই স্টক মার্কেট ধ্বসের মধ্য দিয়ে শুরু হয় The great depression যেটা চলতে থাকবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত। যেই মন্দাটা হবে আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ আর ভয়ংকর অর্থনৈতিক মন্দা। পরবর্তীতে ইতিহাসবিদ ও অর্থনীতিবিদেরা যাকে আখ্যা দিবে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বিপর্যয়কর অর্থনৈতিক ঘটনা বলে।
এই মহামন্দার ফলে বেকারত্ব বেড়ে যায়, প্রায় ১.৫ মিলিয়ন মানুষ তাদের চাকরি হারায়। প্রাইস লেভেলের সাথে উৎপাদনের লেভেলেও একটা ধ্বস নামে। আর এই সবগুলো মিলে ঘটে ভয়ানক অর্থনৈতিক পতন। অর্থনীতিবিদরা ক্লাসিক invisible hand থিওরি অ্যাপ্লাই করে এই পরিস্থিতি সামাল দিতে চেষ্টা করেছিলেন তবে কোন লাভ হয়নি ওতে।

কেন ক্লাসিক্যাল মডেল কাজ করলো না?
যেহেতু প্রায় ১.৫ মিলিয়ন মানুষ চাকরিহারা হয়েছেন, তাই অর্থনীতিবিদেরা ভাবলেন, শ্রমবাজারে (Labor market) একটা উদ্ধৃতি তৈরী হবে। কারণ হঠাৎ করে এত বেকার তৈরী হওয়ায় চাহিদার চাইতে যোগান বেড়ে গিয়েছে। ফলে কম মজুরিতে ফার্মগুলো তাদের কাজে নিতে পারবে। এতে ফার্মগুলো বেশি মানুষ নিয়ে তাদের উৎপাদন বাড়াতে পারবে এবং সেগুলো বিক্রি করে তাদের ক্ষতিও কিছু পুষিয়ে নিতে পারবে।
কিন্তু সে আশায় বালি দিয়ে একটা প্রশ্ন তৈরী হলো ‘উৎপাদিত পণ্যগুলো কিনবে কারা?’ যেহেতু ফার্মগুলো কম মজুরিতে মানুষকে চাকরি দিবে তাই চাকরি পাওয়ার পরেও তাদের রোজগার তেমন বাড়বে না। ফলে বেশি উৎপাদন করেও লাভ হবে না কারণ মানুষের হাতে টাকা নেই। আর তাই ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতির এই আইডিয়াটা একদমই কাজে লাগলো না। ওদিকে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যেতে লাগলো।
ঠিক পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৩০ সালে বেকারত্বের হার মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেল। সে বছর দেড় মিলিয়ন থেকে প্রায় ১৩ মিলিয়ন মানুষ তাদের চাকরি হারায়। অবস্থা যখন দিনদিন খারাপ হচ্ছে, ১৯৩৬ সালে জন মেনার্ড কেইনস নামে এক ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ, যাকে পরবর্তীতে বলা হবে ম্যাক্রোইকোনমিকসের জনক, তিনি একটি বই প্রকাশ করেন যার নাম ‘The General Theory of Employment, Interest and Money’. কেইনস সাহেব এই বইতে ক্ল্যাসিক ইকোনমিক মডেলকে চ্যালেঞ্জ করলেন। শুধু তাই না, নিজেও কিছু পরামর্শ দিলেন এই ক্রান্তি থেকে উত্তোরণের জন্য। বললেন, যেহেতু পুরো অর্থনীতি ঝুঁকির মধ্যে আছে তাই মূল্য এবং মজুরির চাইতে সামষ্টিক চাহিদা বাড়ানোর ব্যাপারটা আমলে নেয়া উচিত এবং ক্ল্যাসিক ইকোনমিক থিওরি ব্যর্থ হওয়ায় সরকারের উচিত হস্তক্ষেপ করা।

সরকার কীভাবে সামষ্টিক চাহিদা বৃদ্ধি করবে?
যেহেতু মানুষের কাছে টাকা ছিল না তাই বড় একটা প্রশ্ন ছিল, পণ্যগুলো কারা কিনবে। কেইনস এই সমস্যা সমাধানের জন্য বাড়িয়ে দিতে বললেন সামষ্টিক চাহিদা।
সাধারণত মানুষের কাছে যখন টাকা, ভোগ করার উদ্দেশ্য এবং কিছু কেনার ইচ্ছা থাকে তখন তার কোন পণ্য বা সেবার প্রতি চাহিদা তৈরী হয়। যদি তার কাছে টাকা না থাকে, স্বাভাবিকভাবেই সে কিছু কিনবে না। এই অবস্থায় সরকার চাকরির সুযোগ তৈরী করে মানুষকে টাকা-পয়সা উপার্জন করার ব্যবস্থা করে দিতে পারে যেন পণ্য বা সেবার চাহিদা সৃষ্টি হয়। সরকার কীভাবে কর্মসংস্থান তৈরী করতে পারে? উত্তর হতে পারে নতুন কোন প্রতিষ্ঠান করে, ট্যাক্স কমিয়ে কিংবা উদ্যোক্তাদের ঋণের ব্যবস্থা করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর, বিশেষ করে ৫০ এর দশকে কেইনসিয়ান ভিউ অর্থনীতিবিদ এবং নীতিনির্ধারকদের ওপর প্রভাব অর্জন করতে শুরু করে। সরকার বিশ্বাস করতে শুরু করে, কর্মসংস্থান এবং উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জনের জন্য তারা হস্তক্ষেপ করতে পারে। এ কারণে এবং আরেকটা মহামন্দার আশঙ্কায় আমেরিকার কংগ্রেসে ১৯৪৬ সালে ‘The Employment Act of 1946’ গঠিত হয়। এই আইনটি ধারণ করেছে ম্যাক্রোইকোনমিকসের মূল তিনটি প্রশ্নকে: ১। কেন উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান কখনও কখনও হ্রাস পায় এবং কীভাবে বেকারত্ব হ্রাস করা যায়? ২। মূল্যস্ফীতির উৎস কী কী এবং কীভাবে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়? ৩। কোনও দেশ কীভাবে তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বাড়াতে পারে? এই প্রশ্নগুলোর ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারণ করা হয়েছে ম্যাক্রোইকোনমিকসের লক্ষ্য: ১। উৎপাদন বৃদ্ধি, ২। স্থিতিশীল মূল্যস্তর এবং ৩। উচ্চ কর্মসংস্থান এবং নিন্ম বেকারত্ব বজায় রাখা।
রূপকথার গল্পের শেষে সবাই সুখে শান্তিতে বাস করতে থাকে বলেই এরপর আর গল্প নেই। এর আগে নানা রকম সমস্যা আছে বলেই সেগুলো আমরা আগ্রহ নিয়ে শুনি। বাস্তব জীবনে এরকম হ্যাপি এন্ডিং নেই বলে কিছুকাল সুখের পর ‘দ্যা গ্রেট ডিপ্রেশন’ এর মতো নতুন কোন সমস্যা হাজির হয়। সেই সমস্যাগুলো যতটা আমাদের ঝামেলায় ফেলে, তারচেয়েও বেশি এনে দেয় নতুন কোন সম্ভাবনা। দিনশেষে আমরা পাই নতুন পথের সন্ধান। আর এভাবেই চলেছে আমাদের জীবন, আমাদের সভ্যতা।

লেখাটি প্রথম প্রকাশ হয় রোর বাংলায়: https://roar.media/bangla/main/economy/the-beginning-of-macroeconomics

1 comment
  1. সামনে বার্ষিক পরীক্ষা, লেখা পড়ে একটা অধ্যায় স্বল্প কিছু পড়া সম্পূর্ণ হয়ে গেলো বদ্দা!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *