ছবির গল্প: জাদুকরের মৃত্যু নেই

0 Shares
0
0
0

১
এপ্রিল মাস, রোজার দিন। বেশ কয়েকদিন হলো বৃষ্টির দেখা নেই। প্রতিদিন আগের দিনের চাইতে বেশি গরম পড়ছে৷ এই গরমে শুরু করলাম ‘জাদুকরের মৃত্যু নেই’ এর শুটিং। সবার সাথে টাইমটেবিল যেহেতু মিলে না তাই বেশিরভাগ কাজকর্ম করতে হলো ভরদুপুরে, ধরে ক্লাসের আগে, পরে, মাঝের গ্যাপের সময়টায়।
প্রথমে এক স্ক্রিপ্ট নিয়ে শুরু করেছিলাম। এক দফা শুটিং শেষ হওয়ার পরে সেটা প্রায় পুরোটা অদল-বদল করে শুটিং শেষ করতে করতেই মাসখানেক পেরিয়ে গেলো। ভাগ্যিস সেই আগের স্ক্রিপ্টে কাজটা করি নাই। কি যে জঘন্য ছিল! ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। এখনো যে খুব আহামরি কিছু হয়ে গেছে সেটা অবশ্য বলবো না। তবু আগেরটার যাইতে হাজারগুণে ভালো।
দুইটা লোকেশন মাথায় নিয়ে একদম প্রথম স্ক্রিপ্টটা লিখসিলাম। একটা DOHS আরেকটা বিইউপি। প্রথমদিন DOHS গেলাম আয়েশার একার কিছু সিনের শট নিতে। শেষ করে যখন ফিরে আসছি তখন কই থেকে কোন গার্ড এসে বললো, এখানে শুটিং করা যাবে না। আমরা বললাম, ঠিক আছে, চলে যাচ্ছি।
স্ক্রিপ্ট বদলানোর জন্য সেদিনের সবগুলো সিন রাখতে পারিনি। প্রথমে যেই স্ক্রিপ্ট নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম সেখানে মাঝখানে আরো কিছু ঘটনা ছিল। সেগুলো বাদ দিতে হলো। আর তাই ফিল্মের শুরুতে দেখা যায় এষা একবার যাচ্ছে, একবার আসছে।
ঠিক করলাম DOHS এর পরের সিনগুলা করবো ঢাকা ভার্সিটিতে। এর আগের শর্টফিল্মও ওখানেই করেছিলাম। সেবার দুই-একটা ব্র‍্যান্ড নিউ এক্সপেরিয়েন্সও হয়েছিলো। নতুন কিছু করতে গেলে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা হবে এ আর নতুন কী! এখানে একটা বলি।
ভিসির বাসার সামনে শুটিং করছিলাম। একটু পর প্রক্টোরিয়াল গাড়ি হাজির। বলে, আপনাদের পরিচয়? একবার মনে হলো উদাস গলায় বলি, ‘আমরা কেউ না। We are nobody.’ কিন্তু সত্যি সত্যি তো আর এসব বলা যায় না। আমার ভাইকে ডাক দিলাম (ও ওই ফিল্মের সিনেমাটোগ্রাফি করে দিতে রাজি হয়েছিলো আর শুটিং শেষে সবাইকে পিজ্জা খাওয়ানোর জন্য প্রোডিউসারও হয়ে গেছিলো)। ভাইয়ের আইডি কার্ড দেখে গাড়ির ভিতর থেকে লোকটা কাকে যেন ‘উনারা ক্যাম্পাসেরই‘ বলে চলে গেল।
২
ক্যামেরার কাজকর্ম আমি পারি না। তবু এবার ক্যামেরা চালাতে হলো। কারণ শুধু একদিনের জন্য সিনেমাটোগ্রাফি করে দেয়ার কথা বলে ভাইকে রাজি করিয়েছিলাম। কিন্তু যখন ঠিক করলাম ঢাকা ভার্সিটিতে বাকি শুটিং করবো তখন (হাসিমুখে) বললাম, ভাই যাবি? রোজার মধ্যে ভরদুপুরে আমার শুটিং-এ ও বিরক্ত। দুই পাশে মাথা নাড়লো। তবে, যাওয়া আসার গাড়ি ভাড়া দিলো বলে এই ফিল্মেও প্রোডিউসার হয়ে গেল।
প্রথমদিনের পর থেকে পুরো সিনেমাটোগ্রাফি আমাকেই করতে হয়েছে। আমার সিনেমাটোগ্রাফির নমুনা দেই। এপ্রিল মাসের ভরদুপুরে রোদের মধ্যে শুটিং করছি। রোদের জন্য ক্যামেরায় কিছু দেখাও যাচ্ছে না। বাসায় এসে এডিট করতে বসে আলোর ঝলকানি ছাড়া আর কিছু দেখতে পেলাম না। পরদিন খেয়াল করলাম, আমি ISO চেঞ্জ করতে ভুলে গেছি।
৩
সব সিনেমার সঙ্গেই ‘change’ আর ‘improvisation’ শব্দদুটো লেগেই থাকে। পরিচালক হয়তো স্ক্রিপ্টের সঙ্গে মিলিয়ে সুন্দর একটা সিন রেডি করে গেলেন। গিয়ে দেখলেন পরিচালকের ভাবনার বারোটা বাজাতে একশ একটা সমস্যা রেডি হয়ে বসে আছে। তবে ‘জাদুকরের মৃত্যু নেই’ বানাতে গিয়ে প্রতিদিন নতুন করে কিছু না কিছু বদলাতেই হয়েছে। এমনকি রিলিজ দেয়ার আধা ঘন্টা আগেও আমি ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বদলেছি। যাইহোক, বদল নিয়ে কিছু বলি।
ক্লাসের গ্যাপের সময়টায় একটা সিনের শুটিং করেছিলাম। সময় পনেরো মিনিট। ভেবেছিলাম ছোট সিন। বেশিক্ষণ লাগবে না (এই ফিল্ম বানাতে গিয়ে বুঝেছি, শট ছোটবড় দিয়ে কথা নেই। এক সেকেন্ডের একটা শট ঠিকঠাক করতেও এক ঘন্টা লেগে যেতে পারে আবার বিশাল ডায়লগের জটিল কোন সিন একবারেই হয়ে যেতে পারে)। সেদিন শটের আগে আয়েশা বোতলে পানি ভরতে গেল। ফিরে আসতে আসতে ক্লাসের সময় হয়ে গিয়েছে। এই সিন আর সেদিন করা হলো না। পরদিন একটু বেশি গ্যাপ পাওয়া গেল। শটগুলো ছোট ছোট:
• এষা অংক করার চেষ্টা করছে, অন্যরা তখন গল্প করছে।
• অংক মিলছে না পরে বিরক্ত হয়ে কেটে দিলো। (আয়েশা সত্যি সত্যি ওর ইকোনমেট্রিক্সের নোট কেটেছে)
• হতাশ হয়ে চুপচাপ বসে রইলো।
ভেবেছিলাম এই তিনটা শট নিতে বেশি হলে তিন মিনিট লাগবে। কিন্তু লাগলো (প্রায়) তিরিশ মিনিট। ক্লাস শুরু হওয়ার অল্প একটু আগে আমাদের এই সিনের শুটিং শেষ হলো।
৪
চেয়ার টেবিলে বসে এষা আর অর্নবের বড় যেই কনভারসেশন হয় সেটা আসলে এত বড় ছিল না। ছবি দেখানোর আগে পর্যন্ত ছিল দুজন। এরপরের অংশটুকু করবো ভেবেছিলাম অন্য জায়গায়, তিন চরিত্র একসাথে। প্রথম পার্টটা করার কথা ছিল লাইব্রেরিতে। কিন্তু কোন এক অদ্ভুত কারণে সেদিনই বারবার ইলেক্ট্রিসিটি ঝামেলা করছিলো।
তারপর যেই সিনে এষা ওর শর্টফিল্ম বানাতে চাওয়ার কথা বলে, ওই সিনটা যেখানে শ্যুট করেছি সেখানে করার কথা ভাবিও নাই। ওই সিনটা তিনবার শ্যুট করেছি, একবার স্ক্রিপ্ট চেঞ্জের আগে আর দুইবার পরে। কিন্তু কোনটাই আমার মন মতো হয়নি। তবু শেষেরটা রেখে দিয়েছি। কারণ এই সিনের মধ্যে আমি একটা শূন্যতা খুঁজে পাই। এষার বিষাদ বোঝাতে এই শূন্যতা মিলে গেছে বলে আমার ধারণা।
একটা সিনের কথা বলে শেষ করছি। স্ক্রিপ্টে লিখেছি এষা হাটতে হাটতে দেখে এক রিকশাওয়ালা বাটনফোন দিয়ে ছবি তুলছে। তারপর এই ছবি তোলার ছবিটা এষা তুলে ফেলে। কিন্তু শ্যুটিং এর সময় আশেপাশে যত রিকশাওয়ালা ছিল সবাইকে বলেও কাউকে রাজি করানো গেল না।
সামনেই একটা ফলের ভ্যান ছিল। ঠিক করলাম, কাউকেই যদি পাওয়া না যায় তাহলে রিকশাওয়ালা বাদ, ফলের ভ্যানের লোকটা ছবি তুলবে। কিন্তু দেখি ফলের ভ্যান খালি। সেখানে মানুষ নেই। শেষ এক রিকশাওয়ালাকে বললাম পরে সেও যখন মানা করে দিলো তখন পাশ থেকে একজন বলে উঠলো, ‘আরে করতে বলতেছে করেন না। করলে কি হবে।’
রিকশাওয়ালা বলে, ‘আমার মন চাইছে করুম না। আপনের করতে মন চাইলে আপনে করেন।’
আশেপাশে দাড়ানো মানুষগুলোর সঙ্গে সেই রিকশাওয়ালার কথাবার্তা আরো হলো। আমি আর আয়েশা নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে দাড়ালাম। বলা যায় না কখন মারামারি লেগে যায়। লোকটা বললো, আমিই করবো। আপনি নামেন।
আমি অবাক। আয়েশা অবাক। লোকটা রেডি। বললো, ‘কি করতে হবে?’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *