আবদ্ধ

0 Shares
0
0
0

সময় এগিয়ে যায়। বেলা বাড়ে। কৃত্রিম যান্ত্রিকতা চাপিয়ে নিজেদের ঠিকানা খুঁজে নিতে বের হয় কোলাহল। ভোরবেলার নিস্তব্ধতায় ছেয়ে থাকা পথঘাট আর স্তব্ধ হয়ে থমকে থাকা কষ্টগুলো তখনো চলে যায় না। বরং খানিকক্ষণ জিরিয়ে নেয়, একটু অবসর পায় ব্যস্ততম মানুষগুলোর ভীড়ে। সারাটা দিন চলে যায় গাড়ির চাকা আর ঘড়ির কাটা ঘুরতে ঘুরতে। গাছের ডালে পেঁচারা যখন সুখ-দুঃখের আলাপ করে তখনো কোন কারণ ছাড়াই কিংবা জীবনের সবচাইতে জরুরী প্রয়োজনে বেরিয়েছে এমন দু-একজনের দেখা মেলে। কুয়াশা জাগা রাতের আঁধার অকারণে সমস্ত সত্যগুলো ধোয়াশায় মুড়িয়ে দেয়। এক সময় ভোর হয়। সময় এগিয়ে যায়।
আমারো দিন এভাবেই যাচ্ছে। হঠাৎ ইচ্ছে হলে বিকেলের দিকে বাইরে থেকে ঘুরে আসি। চারপাশ কেমন যেন বিষণ্ণতায় ভুগছে। উষ্ণতাহীন বিষাক্ত শহরটি বুকে থাকা লক্ষ-কোটি প্রাণ নিয়ে অবিরাম ধুকছে। অসহ্য সব যন্ত্রণা আছড়ে পড়ে প্রতিটি জীবনে। তবু ছুটছে শহরটা। যেন শত্রুর থাবা থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কদ্দূর পালাবে? কতদিন? সমস্তই হিসেবহীন ছন্নছাড়া।
ছুটে চলা মানুষ, সময় আর শহর- এই তিনের ভীড়ে নিতান্তই ক্ষুদ্র বাস্তব সত্য: আমি অস্তিত্বহীন।


২
মহাকালের স্রোত নিরাশার চিহ্ন এঁকে মানবজীবনে আছড়ে পড়ছে। সাক্ষী আমি। মানুষের শূন্য পকেট আর বিরাট অট্টালিকার সারি সাক্ষী। ধ্বংসস্তুপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বিষাদগ্রস্ত প্রাচীন শহরটির প্রতিটি ইট সাক্ষী।
‘আকাশটা তাকিয়ে দ্যাখ।’ আমি চমকে উঠি কিন্তু আকাশ দেখি না। জমে থাকা একখণ্ড ধুসর মেঘ কবিতা নয়, এক ফোটা অশ্রু। সেখানে আনন্দ নেই।
থমকে দাঁড়ালাম। চারপাশের কোলাহল আর ভীড়ের মাঝেও অসীম শূন্যতায় আমি একা। হঠাৎ চোখ আটকে গেল রাস্তার ধারে একগুচ্ছ শুকনো গোলাপ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটার দিকে। উদাস চাহনি তার। চেহারায় মায়া। পাশেই ফুটপাত নিয়ে খেলা করছে হয়তো তারই ছোট বোন। শীতের বিকেলের শেষ রোদ গায়ে মেখে আমি এগিয়ে চললাম নিজের গন্তব্যে। সঙ্গে যান্ত্রিক কোলাহল।


৩
ভোরের প্রথম আবছা আলো জানলায় ধরা দিয়ে নতুন দিনের শুরু করলে আমি ঘুমের ব্যর্থ চেষ্টা ভেঙে উঠে বসি। গভীর চিন্তা তখন আচ্ছন্ন করে। রণাঙ্গনের বিভৎসতাও যেন অতিক্রম করে ফেলে কৃত্রিম ফ্যাকাসে হাসির কাছে সবচেয়ে সুন্দর হাস্যমুখের পরাজিত হওয়া। অবাক লাগে, নিত্যদিনের ঘটনা এটি!
আমি ভোরের পাখির ডাকের জন্য অপেক্ষা করি। কোন শব্দ নেই, নিস্তব্ধতায় থমকে আছে সবকিছু। চোখের সামনে ভেসে আসে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট শিশুর করুণ মুখখানি। তার হাতের শুকনো ফুলগুলোই আমাদের বাস্তবতা।
আবদ্ধ ঘর আমার নিশ্বাস আটকে দেয়। আমি ঘর ছেড়ে পথে বের হই। মানুষ খুঁজে বেড়াই পাগলের মতো। কোথাও কেউ নেই। আরো দূরে যাই। একটা কুকুর শুয়ে আছে। সঙ্গে জবুথবু হয়ে ছেড়া জামার এক বুড়ো। কুয়াশার চাদর তার শীতবস্ত্র। কাছে যেতে পারি না। ফিরে আসি। আবদ্ধ ঘরে এসে আশ্রয় নেই। দীর্ঘকাল পর জানলা খুলি। বরফের মতো শীতল বাতাসে আমার ঘর ভরে যায়। আমি প্রাণভরে শ্বাস নেই। খানিক পর আবার বের হই।
কুয়াশার চাদর জড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকা শুকনো ফুলের জীবন এখানকার নিত্যকার নির্মম গল্প। এই গল্পের কোন শেষ পাতা নেই। আর তাই জীবন এই কৃত্রিমতায় সাজিয়ে রাখা যান্ত্রিক কোলাহলেও ঠিকানা খুঁজে নেয়। হারিয়ে যাওয়া ঠিকানা খুঁজতে আমি চলতে থাকি দিকহারা পথিকের মতো।
বিদ্ধস্ত এই শহর, এই জীবন এখন আর স্বপ্ন দেখায় না। তবু বহুকাল পর নতুন স্বপ্ন তৈরীতে কারণ ছাড়াই একটা শুকনো গোলাপ কিনি। ঘ্রাণ নেই জানি তবু গন্ধ শুকি। যত্ন করে পকেটে রেখে দেই পাপড়িগুলো জমাবো বলে। ক্ষুদ্র কিছু কাজ নির্বাক সুখ এনে দেয় বলেই জীবন প্রাণহীন হয় না, ধ্বংসস্তুপের ওপর দাঁড়িয়েও টিকে থাকা যায়।
শীতকাল, দ্রুত বেলা ফুরিয়ে গেল। ঘরে ফিরলাম সন্ধ্যা নামার পর। সম্পূর্ণ অন্য রকম একটা দিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমি বছর দশেক পর প্রথমবারের মতো ছাদে গেলাম। রাতের আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ একখণ্ড মেঘে ঢাকা পড়েছে। মেঘ- এক ফোটা অশ্রু। সে অশ্রুতে আনন্দ ঝরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You May Also Like

ইস্টিশন

ইমা কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছালো দৌড়াতে দৌড়াতে। ট্রেন ছাড়ার কথা দুপুর একটায়। এখন বাজে দুইটা সাত। সকাল থেকে একটু…
Read More

চোরের গপ্পো

‘জাতি হিসেবে আমরা গবেট।’ঝাঁঝ মেশানো গলায় আফজাল ভাই কথাটা বললেন। শুনেই বুঝে গেলাম আজ বিরাট লেকচার হবে। আফজাল…
Read More

মেঘফুল

বাইরে রোদ ঝলমল করছে। অথচ আজ সারাটা দিন সূর্য ছিল মেঘের আড়ালে। সেই ভোরবেলায় বৃষ্টি নামার পর আর…
Read More