ইমা কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছালো দৌড়াতে দৌড়াতে। ট্রেন ছাড়ার কথা দুপুর একটায়। এখন বাজে দুইটা সাত। সকাল থেকে একটু পরপর বৃষ্টি হচ্ছে। সারা বর্ষা গেল বৃষ্টির দেখা নেই অথচ এখন এই শরতকালে সারাদিন আকাশ অন্ধকার। বৃষ্টি বলে রিকশাওয়ালারা একেকজন বাংলার শেষ নবাবের ভূমিকায় আবির্ভূত হয়ে পঞ্চাশ টাকার ভাড়া চাচ্ছে একশ টাকা। কারণ বৃষ্টি গেলেই নবাবি ফুরিয়ে যাবে তাই যত পারা যায় ঘরে টাকা তুলে নিতে হবে। আর তাছাড়া বৃষ্টিতে রিকশা চালানোর কষ্ট প্যাসেঞ্জারের সিটে বসা বৃষ্টি বিলাসীরা বুঝতে পারে না বলে শাস্তি হিসেবে জরিমানা বাবদ আরো কিছু টাকা যোগ করাটা বাঞ্চনীয় বটে।
দেরি হয়ে যাচ্ছে তবু অদ্ভুত ভাড়ার নিচে কেউ যেতে রাজি হচ্ছিলো না। শেষ পর্যন্ত একজনকে পাওয়া গেল যে বেশি চাইলেও অন্যদের তুলনায় সহ্যনীয় তাই সেই রিকশাই ইমা ঠিক করলো। কিন্তু ওঠার পর রাস্তায় যতবার রিকশাওয়ালাকে বলেছে তাড়াতাড়ি যেতে, রিকশাওয়ালা ততবার আরো আস্তে আস্তে এসেছে। যেন কম ভাড়ার শাস্তি দেয়া হচ্ছে। ভাড়া দেয়ার সময় দেখা গেলো একশ টাকা ভাঙতি নেই। পাশের দুইটা রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করেও যখন পাওয়া গেল না ইমা তখন চল্লিশ টাকা বেশিই দিয়ে দিলো। কিছুই করার নেউ। হাতে সময় বড্ড কম। যেকোন সময় ট্রেন মিস হবে।
বাংলাদেশে কোন কিছুই সময় মতো হয় না। স্টেশনের ক্ষেত্রে এই কথাটা এক ডিগ্রি বেশি সত্যি৷ ট্রেন কোথায় যেন আটকে গেছে, আসতে দেরি হবে। সে এগিয়ে খালি দেখে একটা বেদিতে বসে ব্যাগ খুলে একটা বই বের করলো। বইটার নাম one hundred years of solitude, গত সাড়ে চার মাস ধরে পড়ছে। এখনো অর্ধেকও শেষ হয়নি।
ইমা বইতে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করছে। পারছে না। স্টেশনের কোলাহলে সে বারবার ডুবে যাচ্ছে। ওর একটা বন্ধু আছে। অদিতি নাম। পুরো পৃথিবী সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করার অদ্ভুত ক্ষমতা নিয়ে সে জন্মেছে। মাছের বাজারে ছেড়ে দিলেও জটিল সব থিওরি নির্বিকার ভঙ্গিতে পড়ে যেতে পারবে। পড়া শেষ হলে মাথা তুলে থিওরির দুই-চারটা ভুল নিয়ে দুই ঘন্টার লেকচারও দিতে পারবে। মাঝেমাঝে অদিতিকে দেখে ইমার হিংসা হয়। ও এত সৌভাগ্যবান না। বেশি শব্দ হলেই ওর মাথা ধরে যায়। কড়া করে চা খেয়ে মাথা ব্যথা কমাতে হয় তখন। মনযোগ দেয়া তো বহুদূরের বিষয়।
ইমা বই ব্যাগে ভরে রাখলো। এই জায়গাটায় বড্ড ভীড়। অন্য কোথাও যাওয়া দরকার। সময়টাও কাটানো প্রয়োজন। ইদানীং কিছুই ইমার ঠিকঠাক হচ্ছে না। এই পরশুর কথাই ধরা যাক৷ শখ করে নতুন একটা রেসিপি রান্না করতে গেছিলো। চিকেন আর পাস্তা দিয়ে ইতালিয়ান একটা ডিশ। সবকিছু রেডি করার পর দেখা গেল সব আছে, শুধু পাস্তাটাই নেই। মেজাজটা এত খারাপ হলো বলার মতো না। আবার আজকের এই ট্রেনের কাহিনী। বিরক্ত লাগছে।
বিরক্তি কাটানোর সহজ উপায় হচ্ছে মানুষ দেখা৷ স্টেশনে কত রকম মানুষ! প্রত্যেকে নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। একেকজনের কাজ দেখেই সারাদিন পার করে দেয়া যায়। অল্প বয়সী এক ছেলের হাতে এক্সরে রিপোর্ট আর ডাক্তারের ফাইল দেখে ইমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। পাশে মধ্যবয়স্ক যে মহিলাকে দেখা যাচ্ছে রিপোর্টটা নিশ্চয়ই তার। ডাক্তারের কাগজপত্র দেখলেই মনটা কেমন যেন করে সবসময়।
২
ট্রেনের দেখা নেই। ইমা চা শেষ করে বইটা আবার বের করলো। পড়া হবে না সে জানে। তবু সময় কাটানোর বৃথা চেষ্টা চালানো। এরমধ্যে এক দফা বৃষ্টি হয়ে গেছে। আকাশ এখনো কালো। আবহাওয়ার মতো কনফিউজড জিনিস ইদানীং খুব বেশি চোখে পড়ে না। এই গরম, এই ঠান্ডা। এই রোদ, এই বৃষ্টি।
‘আপা?’ বয়স্ক এক লোক দাঁড়িয়ে আছে। মুখে খোচা খোচা দাড়ি। মাথার চুল কাচা পাকা, উষ্কখুষ্ক। কন্ঠে একটা সঙ্কোচ, চোখেমুখে হতাশা। দেখে মনে হচ্ছে ইমাকে পেয়ে কিছুটা আশা দেখেতে পাচ্ছে। খুব সম্ভবত সাহায্য চাইতে এসেছে। চিকিৎসার জন্য টাকা প্রয়োজন জাতীয় ব্যাপার। এমন হলে দশ বিশ টাকা দিলেই চলে যাবে। তবে ইমার কাছে দশ বিশ টাকা নেই। একশ টাকার একটা নোট ছিল। সেটাও রিকশাওয়ালাকে দিয়ে দিয়েছে।
‘আপনারে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?’
‘জ্বি বলুন।’
লোকটা কীভাবে শুরু করবে সেটা বুঝতে পারছে না বলে মনে হলো। কিছুটা সময় নিয়ে বললো, ‘করোনায় আমার চাকরি চলে গেছে। বড় মেয়েটা পলিটেকনিকে পড়ে। কেমিস্ট্রিতে। আর এক বছর আছে। রেজাল্ট মাশাল্লাহ ভালো। বলছে, রেজাল্ট এরকম ধইরা রাখতে পারলে নাকি বৃত্তি দিবে।’ এটুকু বলে লোকটা থামলো। সে ঠিক কি চাইছে তা এখনো পরিষ্কার না। ‘এখন আমার তো আয় রোজগার নাই। মেয়েটা টিউশনি কইরা যা পারে চালাইতেছে। আরো এক বছর আছে। মেয়েটা পাশ করার পর একটা চাকরি পাবে?’
স্রেফ এই কথা জিজ্ঞেস করার জন্যই কি লোকটা এসেছে? নাকি সাহায্য চাইতে এসেছিলো, সম্মানের জন্য বলতে পারলো না? ইমা বুঝতে পারলো না। কয়েক মুহূর্ত লাগলো পুরো ব্যাপারটা গুছিয়ে নিতে। চাকরি পাবে কি পাবে না সেটা ও কি করে বলবে। আর এভাবে সম্পূর্ণ অপরিচিত কাউকে রাস্তাঘাটে কেউ জিজ্ঞেস করে, আমার মেয়ে চাকরি পাবে নাকি! তবে লোকটাকে দেখে আসলেই মায়া লাগলো। বললো, ‘হ্যাঁ। চাকরি তো পাওয়ার কথা।’
‘পাবে তো?’
‘হ্যাঁ। পাওয়ার তো কথা।’
‘আপনে শিক্ষিত মানুষ। তাই জিজ্ঞেস করলাম কথাটা। মনে কিছু নিয়েন না।’ বলে লোকটা উঠে পড়লো।
পুরো ব্যাপারটা ভীষণ অদ্ভুত লাগলো। লোকটার কথা শুনে মনে হলো আসলেই মেয়ের চাকরি হবে নাকি সেটাই জিজ্ঞেস করতে এসেছিলো। কিন্তু এভাবে কেউ জানতে চায় নাকি! যা খুশি হোক। ইমা আরেক কাপ চা নিয়ে যেখানে মোটামুটি কম ভীড় সেখানে চলে এলো। স্টেশনের কয়েকটা বাচ্চা একসাথে গল্প করছে। কি নিয়ে সেটা অবশ্য শোনা যাচ্ছে না। তবে বোঝা গেল খানিক বাদেই যখন বৃষ্টির ফোটাগুলো পড়তে শুরু করলো। সবগুলো বাচ্চা দলবেঁধে এক দৌড়ে প্ল্যাটফর্মে গিয়ে লাফালাফি করতে করতে বৃষ্টিতে ভিজছে! ওদের চোখেমুখে জগতের সকল আনন্দধারা বৃষ্টির মতো আছড়ে পড়ছে। ইমা আনমনে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। আমরা বৃহৎ আনন্দের সন্ধানে প্রতি মুহূর্ত কাটাই বলে সুখের মুহূর্তগুলো কখন চলে যায় বুঝতেই পারি না। হয়তো পুরো স্টেশনে এই বাচ্চাগুলোর মতো খুশিতে এই মুহূর্তে আর কেউ নেই। সবাই সেই বাবার মতো আনন্দের অপেক্ষায় আছে। আচ্ছা, মেয়ের চাকরি পাওয়ার পর আনন্দিত হওয়ার অপেক্ষায় থাকা সেই বাবা কি সেদিন এই বাচ্চাদের মতো এমন আনন্দে উল্লসিত হবে?