মেঘফুল

0 Shares
0
0
0

বাইরে রোদ ঝলমল করছে। অথচ আজ সারাটা দিন সূর্য ছিল মেঘের আড়ালে। সেই ভোরবেলায় বৃষ্টি নামার পর আর বিরাম নেই, চারপাশ অন্ধকার করে কী বৃষ্টিই না হলো। যেন কখনো থামবেই না আর। বেলা গড়ানোর পর তুমুল বর্ষণ ধীরে ধীরে পড়ে এলো। জমে থাকা মেঘগুলো সরতে শুরু করলো তখন থেকেই। রোদ উঠলেও আশেপাশে বৃষ্টির চিহ্নগুলো হারিয়ে যায়নি, ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এখনো। রাস্তায় পানি থইথই করছে। মাঝেমধ্যে দুই-একজন হাটু পর্যন্ত প্যান্ট উঁচিয়ে, হাতে ছাতা আর জুতা নিয়ে এদিক দিয়ে যাচ্ছে আসছে। পরিবেশটা শীতল, বিষণ্ণ। এর মাঝেও কয়েকটা বাচ্চা উল্লাসের সকল বাঁধ ভেঙে রাস্তার নোংরা পানিতে সুখের সাগর সৃষ্টি করে মহানন্দে ঝাঁপাঝাঁপি করছে।
ফুল লতাপাতার নকশা করা নতুন কাপে রং চা নিয়ে আজিজ বারান্দায় বসে বাচ্চাগুলোকে লক্ষ্য করছে। বারান্দাটা বেশ লম্বা, একটা পুরনো কাঠের চেয়ার রাখা এক কোণে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় কেউ একজন তার সমস্ত একাকিত্ব কাটাতে এই চেয়ারটায় এসে বসে। বারান্দার এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত দড়ি টানানো। কাপড় মেলা হয় এখানে। বৃষ্টি বলে আজ কোন কাপড় নেই। বারান্দাটা খালি পড়ে আছে।
রঙ চা আজিজ খুব একটা খায় না। কেন যেন আজ হঠাৎ খেতে ইচ্ছা করলো। তার কাপটি নতুন এবং বেশ চমৎকার। শৈল্পিক একটা ছোঁয়া আছে রুচিশীল মাত্রই এ কথা স্বীকার করবে। সাদার মাঝে হালকা হলুদের প্যাঁচানো নকশাটাও দারুণভাবে ফুটে উঠেছে।
নতুন জিনিস প্রথম ব্যবহারে আজিজের এক ধরনের ছেলেমানুষী আনন্দ হয়। চায়ের কাপের বেলায় সেটা হচ্ছে না। নিজস্ব ছেলেমানুষী আনন্দের খেয়াল হারিয়ে বাচ্চাগুলোর আনন্দ সে এক দৃষ্টিতে দেখে যাচ্ছে। ওদের ঝাঁপাঝাঁপির শব্দ শুনতে বেশ লাগছে। আনমনে নিজেও ভাবছে নিজের ছেলেবেলার কথা। তখন কী দুরন্তই না ছিল সে!
ওদের বাড়ির সামনে ছোট্ট, শান্ত একটা নদী ছিল। ভর দুপুরে পাড়ার সব ছেলে-ছোকরা ঝাঁপাঝাঁপি করতো সেখানে। বর্ষাকালে নদীর পানি উপচে ডাঙায় এসে যখন থৈথৈ করতো তখন সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়তো কলাগাছের ভেলা তৈরীতে। নদীকে সাগর বানিয়ে ভেলায় ভেসে পড়তো অজানার উদ্দেশ্যে। জ্যৈষ্ঠের কাঠফাটা রোদের ক্লান্ত দুপুরে সবাই যখন একদণ্ড ঘুমিয়ে নেয়ার প্রস্তুতি নিতো তখন তারা বের হতো রাজ্যের দস্যিপনা মাথায় নিয়ে।
আজিজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে চায়ের কাপে চুমুক দিল। বৃষ্টি বড় উদাস করে দেয়। আচ্ছা, এখনো কী ছেলেরা নদীতে ঝাঁপাঝাঁপি করে? সবাই মিলে মাছ ধরে? বৃষ্টির মধ্যে কাদামাটিতে ফুটবল খেলে? উত্তর জানা নেই তার। দীর্ঘদিন হলো গ্রামে যাওয়া হয় না।
প্রতিদিন এ সময়টায় আজিজ অফিস থেকে বের হওয়ার তাড়া শুরু করে। ফাইলের স্তুপ থেকে নিস্তার পেয়ে সারাদিন পর বাড়ি ফেরার আয়োজন করতে করতেই কেটে যায় সময়টা। আজ ছুটির দিন, সে ঝামেলা নেই। এখানে নিশ্চিন্তে বসে ছেলেবেলার কথা ভাবছে। ভালোই লাগছে ভাবতে। কী সুন্দর মিষ্টি সময় ছিল তখন!
“টোস্ট দেবো?”
কোত্থেকে যেন রাশেদা এসে কথাটা জিজ্ঞেস করে আজিজের চিন্তার মধ্যে বাধা দিয়ে মেজাজ বিগড়ে দিল। বিরক্ত গলায়, যেন কেউ মুখে লেবু কচলে দিয়েছে অমন মুখ করে বললো, “প্রতিবার এক কথা জিজ্ঞেস কর কেন বলতো?”
রাশেদা যেন আকাশ থেকে পড়লো, “ওমা, কোন কথাটা বারবার বলি?”
“আমি যে চায়ের সাথে কিছু খাই না এটা জানো না?”
রাশেদা হেসে বললো, “একদম ভুল হয়ে গেছে। মনেই থাকে না।”
এ কথার পর আজিজ আর কি বলবে বুঝতে পারলো না। তার সকল কথা মরুভূমির পানির মতো শুকিয়ে গেল। কয়েকটি নীরব মুহূর্ত কেটে যাওয়ার পর আজিজ শান্ত গলায় বলল, “তুমি চা খাবে না?”
“আজ খেতে ইচ্ছা করছে না।”
বেশ কয়েকটা বছর পার হলো এই মানুষটার সঙ্গে রাশেদার বিয়ে হয়েছে। সে তখন কলেজে পড়ে। হঠাৎ একদিন তার ছোট চাচা একটা সম্বন্ধ এনে বাবার সাথে দেখা করতে এলো। রাশেদার নিজের বিয়ের ইচ্ছা না থাকলেও বাবার পাত্র খুব পছন্দ হলো। এই ছেলে তিনি হাতছাড়া করবেনই না। ছেলে সৎ এবং শিক্ষিত। ভালো একটা চাকরি করে। উপরি পাওনা হিসেবে দেখতেও সুন্দর। খোঁজ খবর নিয়ে তিনি কথা এখানেই পাকা করলেন।
রাশেদার খুব ইচ্ছা ছিল পড়ালেখা শেষ করবে। এজন্য বিয়ে নিয়ে কত ঝামেলা হলো সবার সাথে। শেষ পর্যন্ত কেন যেন সে আর মানাও করতে পারেনি। এক সন্ধ্যায় খুব উৎসব করে তার বিয়ে হয়। বাড়ি ভর্তি মানুষের আনন্দের হাসি আড়াল করেছিলো তার নিজের কষ্ট। কেউ কি জানে, সেই দুঃখ আজও সে বয়ে বেড়ায়?
বিয়ের পর নানা ঝামেলায় আর পড়ালেখা হয়নি তার। বাবাও মারা গেছেন বছর খানেক হলো। জীবন চলছে জীবনের মতো। এ বাড়িতে আসার পর প্রথম দিকে ক্লান্ত লাগতো খুব। এখন কেমন যেন সয়ে এসেছে।
রাশেদা বললো, “মোড়ের সামনে একটা দোকানে নাকি ভালো শিঙারা বানায়। দুইটা এনে দেবে?”
“এই পানি পার হয়ে শিঙারা আনতে বলছো?”
“সামনেই তো দোকানটা। এটুকু পানিতে কিছু হবে না। কত লোক যাচ্ছে দেখছো না?”
এক হাটু নোংরা পানি পার হয়ে শৌখিন শিঙারা আনতে যাওয়া নেহাত বিলাসিতা ঠেকলো আজিজের কাছে। যারা এদিক দিয়ে যাচ্ছে তারা নিশ্চয়ই জরুরী প্রয়োজনে বেরিয়েছে। বিপদ ছাড়া কে ঘর ছাড়ে এমন দিনে? স্বামীকে নিশ্চুপ দেখে রাশেদা বললো, “এনে দেবে?”
বলার ভঙ্গিতে যেন একটা মিনতি মিশে আছে দুইটা শিঙারার জন্য। আজিজের মায়া লাগলো। বললো, “চা শেষ করে বের হচ্ছি।”
রাশেদা চলে যাচ্ছিল। হঠাৎ কী যেন মনে পড়ায় ফিরে এসে বললো, “ওখানে কিন্তু কয়েকটা দোকান আছে। সব দোকানে যাবে না। মোটা করে একটা লোক আছে। তার দোকান থেকে আনবে। আর বেশি করে আনবে। শায়লাও খেতে চেয়েছে।” কথাগুলো এক নিশ্বাসে বলে সে আর দাঁড়ালো না। চলে গেলো বাসার ভেতরের দিকে।
মোটা লোকের দোকানটার খোঁজ সে শায়লার কাছেই পেয়েছে। ওপর তলার আপার সঙ্গে শায়লার খুব ভাব। মাঝেমাঝে সেখানে যায় গল্প করতে। আপা একদিন ওই দোকান থেকে শিঙারা এনে খাইয়েছিলেন। খুব নাকি স্বাদ তার। শায়লা মাঝেমধ্যেই রাশেদার কাছে দোকানটার কথা বলে। শুনতে শুনতে রাশেদারও শখ হয়েছে খেয়ে দেখার।
রাশেদার সঙ্গে কথা বলতে বলতে চা অনেকখানি জুড়িয়ে এসেছে। আজিজ চায়ে চুমুক দিল। ফুল লতাপাতার নকশা খুটিয়ে দেখতে দেখতে বাল্যকালের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। একবার পড়ন্ত বিকালে হাটতে হাটতে বাড়ি থেকে খানিকটা দূরের একটা ধান ক্ষেতে চলে গিয়েছিল। চারপাশে পাকা সোনালি ধান।
হঠাৎ আকাশ কালো করে শুরু হয় বিদ্যুৎ চমকানো। চারপাশ অন্ধকার। দূরের আকাশে একটা আঁকাবাঁকা রেখায় কয়েক মুহূর্তের জন্য আলোর ঝলকানি ছড়িয়ে পড়লো ক্ষেত ভর্তি পাকা ধানের ওপর। অপূর্ব, ভয়ংকর সেই সৌন্দর্য সে কখনো ভুলতে পারেনি।
বাচ্চাদের ঝাপাঝাপির শব্দ আর পাওয়া যাচ্ছে না। রোদ কমে আসার সঙ্গে দল বেধে সন্ধ্যা নেমে আসছে। আবার আকাশে অসংখ্য মেঘ ভীড় জমাতে শুরু করেছে। বৃষ্টি হবে বোধহয়।
আজিজের চা শেষ হয়েছে। এখন আর রাশেদার জন্য শিঙারা আনা যাবে না। ঠান্ডা বাতাসের সঙ্গে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। কিছুক্ষণ আগে ছাতা নিয়ে বের হলেও নিয়ে আসা যেতো। অবশ্য আজ দোকানটা খোলা ছিল নাকি কে জানে। সারাদিনের বৃষ্টিতে শহরটা পুরো তলিয়ে গেছে। মানুষ হাটতে পর্যন্ত পারছে না ঠিকমতো। শিঙারা খেতে দোকানে কে যাবে? তবু একবার গিয়ে দেখাই যেতো খোলা আছে কিনা দোকানটা। বৃষ্টির মধ্যে ধোঁয়া ওঠা গরম গরম শিঙারা জমে ভালো। আজিজের নিজেরই এখন খেতে ইচ্ছা করছে। দুটা শিঙারা হলে মন্দ হতো না।
আকাশ কালো করে নেমে আসছে অবিরাম বর্ষণ। প্রচন্ড বাতাসের সাথে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে ঘনঘন। ঝড় উঠছে ধীরে ধীরে। রাশেদা ঝড় ভয় পায়। একধরনের বিষাদ ঘিরে ফেলে। আতঙ্ক আর অস্থিরতা মিলিয়ে অদ্ভুত এক অনুভূতি হয়। অনুভূতিটা কেমন তা ঠিক বুঝতে পারে না সে। তবে মন খুব খারাপ করে দেয়। বারবার অতীতের স্মৃতি মনে হতে থাকে ঝড়ের ঝাপটার মতো। অনেকদিন আগের কোন এক মুহূর্ত ধরা দেয় তখন। পুরোটা চোখের সামনে ভেসে ওঠার আগেই মিলিয়ে যায়। তখন আরেকটা মুহূর্ত চলে আসে। এরপর আরো একটা…।
আজিজ বারান্দা ছেড়ে নিজের ঘরে এসে বসেছে কিছুক্ষণ হলো। ভালো ঝড় উঠেছে। কারেন্ট চলে গেছে অনেকক্ষণ। হাতড়ে একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে খাটের ওপরেই রেখেছে। মোমবাতির শিখা অনবরত কাপছে যেন ঝড়ের কারণে সে ভয় পেয়েছে।
রাশেদাকে শিঙারা খাওয়াতে না পারায় আক্ষেপ হচ্ছে তার। হয়তো ছোট্ট একটা আবদার ছিল। তবু মনের ভেতর বারবার বিধছে। কাল অফিস থেকে ফেরার পথে মনে করে গরম গরম শিঙারা নিয়ে আসতে হবে। আজ আনতে পারলে রাশেদা দারুণ খুশি হতো। সুখ দুঃখের গল্প করার সময় এক হাটু পানি পার হয়ে শিঙারা এনে দেয়ার কাহিনিটা বারবার বলতো। ছোট আনন্দগুলি মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে গেথে যায়। সেগুলো সে দীর্ঘদিন যত্ন করে আগলে রাখে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You May Also Like

ইস্টিশন

ইমা কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছালো দৌড়াতে দৌড়াতে। ট্রেন ছাড়ার কথা দুপুর একটায়। এখন বাজে দুইটা সাত। সকাল থেকে একটু…
Read More

চোরের গপ্পো

‘জাতি হিসেবে আমরা গবেট।’ঝাঁঝ মেশানো গলায় আফজাল ভাই কথাটা বললেন। শুনেই বুঝে গেলাম আজ বিরাট লেকচার হবে। আফজাল…
Read More

আবদ্ধ

সময় এগিয়ে যায়। বেলা বাড়ে। কৃত্রিম যান্ত্রিকতা চাপিয়ে নিজেদের ঠিকানা খুঁজে নিতে বের হয় কোলাহল। ভোরবেলার নিস্তব্ধতায় ছেয়ে…
Read More