দেখা না দেখা

0 Shares
0
0
0

কিছুক্ষণ পরপর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। জীবনের সব অন্ধকার দূর করে এক মুহুর্তের জন্য আলো ঝিলিক দিয়ে উঠছে। কিছুটা আশা জাগানোর আগেই সে আলো আবার নিভে যাচ্ছে। ওদিকে মেঘের শব্দ মনের সব সংশয় ঠিকই বাড়িয়ে দিচ্ছে। ওই বুঝি বৃষ্টি নামলো। এখনো ধীরে ধীরে পড়ছে, একটু পর গতি বাড়বে। মনের সব ব্যাকুলতা তখন আকাশ থেকে ঝরে পড়বে।
না, বৃষ্টি খুব একটা বাড়লো না। আমার চেপে রাখা কষ্টের মতো আকাশটাও নিজেকে সামলে নিলো। কি অদ্ভুত মিল দুজনের।
খুব গরম পড়েছে কদিন। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। সারাদিন রোদের পর সন্ধ্যা থেকেও ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। তারপর হুট করেই বিদ্যুৎ চমকানো শুরু হলো। বৃষ্টি আসবে, দুনিয়াটা ঠান্ডা হবে, মন জুড়িয়ে বৃষ্টির শব্দ শুনবো- এসব কল্পনায় রাখতে দিয়ে বৃষ্টি চলে গেল। খুব বেশি আশা করেছিলাম বলেই বোধহয় বৃষ্টিটা আর হলো না। এই জীবনে বেশি আশা যে করতে নেই এটাই এখনো শিখে উঠতে পারলাম না। এক ভুল বারবার করা আমার বাজে স্বভাব। ইংরেজি রিসিভ বানানে ‘আই’ আগে না ‘ই’ আগে সেটাও যেমন আর শেখা হলো না। এই ভুলের মাশুল যে এক জীবন ধরে দিয়ে যেতে হবে সে আমি আগেই বুঝেছি। তবু বড্ড ক্লান্ত লাগে মাঝেমাঝে।
আমি শুয়েই রইলাম। বৃষ্টি জমিনে না হোক, আমার চোখ বেয়ে দুফোটা বালিশে পড়ুক।
এখন কি মাস? এপ্রিল বা মে কিছু একটা হবে। গরমে টেকা যাচ্ছে না। তারমধ্যে ঘন্টার পর ঘন্টা লোডশেডিং। হাতের কাছে হাতপাখা আছে। তবে বাতাস করতে ইচ্ছা করছে না। দরদর করে ঘেমে নেয়ে যাচ্ছি। ঘামে বিছানার চাদর ভিজে যাচ্ছে। ভিজুক। বৃষ্টিতে রাস্তা তো আর ভিজলো না, ঘামে আমার চাদরই ভিজুক।
হাতের কাছেই ফোনটা থাকার কথা কিন্তু পাচ্ছি না। বালিশের নিচে পড়লো নাকি? না, নেই। অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে পায়ের কাছ থেকে উদ্ধার করলাম। পায়ের কাছে কিভাবে গেল সেটা অবশ্য এক রহস্য। তবে সেই রহস্য উদ্ঘাটন করবো না। সবকিছুর মীমাংসা করতে নেই, জীবনে কিছুটা রহস্যের ভীষণ প্রয়োজন।
ইনবক্সে ঢুকলাম। প্রথম মেসেজটা গত সপ্তাহের। আমিই পাঠিয়েছিলাম। ওইপাশের মানুষটার এখনো দেখার সময় হয়নি।
আবার মেঘ গুড়গুড় করছে। দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। বৃষ্টিও হবে না, লোডশেডিংও শেষ হবে না। এখানে বাতাস শুরু হওয়ার আগে লোডশেডিং শুরু হয়। তারপর যখন নিশ্চিন্ত হয় যে গাছের পাতায় জমে থাকা পানি থেকেও এক ফোটা আর জমিনে পড়বে না তখন এর শেষ হয়। আমি ফোন রেখে হাতপাখাটা হাতে নিলাম। বাতাস করতে করতে ঘুমানোর চেষ্টা চালানো যাক।
হাত ব্যথা হলো, তন্দ্রার মতো এলো, ঘুম এলো না। আমি উঠে বসলাম। রাত বারোটা চার। ফোনের চার্জও প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। যেকোন সময় এর শেষ আলোটুকু নিভে যাবে। কারেন্ট মনে হয় না আজ রাতে আর আসবে। আমি বসে রইলাম। জানালা দিয়ে একবার বাইরে তাকালাম। অন্ধকার। আলো থাকলেও অবশ্য দেখার মতো কোন দৃশ্য থাকতো না।
তবে রাস্তার ওই পাড়ের বাসার জানালাগুলো অন্ধকারেও আবছা দেখা যাচ্ছে। এত বড় বিল্ডিং এর সব জানালা আমার দিকে তাকিয়ে আছে বুঝতে পারছি। এদের সাথে খানিক সময় গল্প করবো নাকি? গল্প উপন্যাসে দরজা-জানালার সঙ্গে মানুষ কাল্পনিক আলাপ শুরু করে। মানুষ হয়তো বলে ‘দরজা কেমন আছো?’ দরজা তখন উত্তর দিবে বইয়ের বিষয়বস্তুর উপর। ভারী বই হলে এক রকম। আবার সস্তা প্রেমের কাহিনী হলে হয়তো বলবে ‘সারাদিন তোমার জন্য বসে আছি। এখন আসার সময় হলো?’ অথবা ‘আমি খোলা আছি। এক্ষুনি বেরিয়ে যাও।‘
আমি যেহেতু হালকা বা ভারী কোন বই-ই লিখছি না তাই জানালার সঙ্গে আলোচনা শুরু করলাম না। তাছাড়া আমাকে হারানোর বা পাওয়ার কোন আবদার কিংবা অভিমান এদের নেই। মানুষের মধ্যে অবশ্য এই ব্যাপারটা আছে। আর আছে বলেই আমরা দূরে সরে যাই। দূরে সরে যাই কখনো যাকে পেতে চাই তাকে পেতে। কখনো হারিয়ে ফেলতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You May Also Like

ইস্টিশন

ইমা কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছালো দৌড়াতে দৌড়াতে। ট্রেন ছাড়ার কথা দুপুর একটায়। এখন বাজে দুইটা সাত। সকাল থেকে একটু…
Read More

চোরের গপ্পো

‘জাতি হিসেবে আমরা গবেট।’ঝাঁঝ মেশানো গলায় আফজাল ভাই কথাটা বললেন। শুনেই বুঝে গেলাম আজ বিরাট লেকচার হবে। আফজাল…
Read More

মেঘফুল

বাইরে রোদ ঝলমল করছে। অথচ আজ সারাটা দিন সূর্য ছিল মেঘের আড়ালে। সেই ভোরবেলায় বৃষ্টি নামার পর আর…
Read More