চোরের গপ্পো

0 Shares
0
0
0

‘জাতি হিসেবে আমরা গবেট।’
ঝাঁঝ মেশানো গলায় আফজাল ভাই কথাটা বললেন। শুনেই বুঝে গেলাম আজ বিরাট লেকচার হবে। আফজাল নামটা শুনলে গুরুগম্ভীর এক আংকেলের কথা মনে হতে পারে কারণ আজকাল এই নামটা আমাদের জেনারেশনে খুব একটা দেখা যায় না। তবে আফজাল ভাই আমাদের চাইতে খুব একটা বড় না। সত্তর আশি কিংবা নব্বইয়ের দশক হলেও হয়তো নামটা ঠিক ছিল কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় আমাদের বয়সী একজনের নাম আফজাল এটা মানতে কষ্ট হতেই পারে। আফজাল ভাইয়ের ছোট ভাইয়ের নাম আফসার। আমার চাইতে দুই বছরের ছোট। ওর নামটা মডার্ন না ওল্ড সেটা বুঝতে পারি না। মাঝেমাঝে মনে হয় বেশ আধুনিক আছে নামটা, আবার কখনো বড্ড সেকেলে লাগে।
আফজাল ভাই ইউনিভার্সিটির সেকেন্ড ইয়ারে পড়েন। বেশ জ্ঞানীগুণী মানুষ। আমাদের সবার যেমন ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ খারাপ হয়ে গিয়েছে বলে চশমা নিতে হয়েছে আফজাল ভাইয়ের কিন্তু তা না। উনারও চশমা নিতে হয়েছে, বড় ফ্রেমের চশমা তবে আমাদের মতো ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার জন্য নয়, বই পড়ার জন্য। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি উনাদের বাসা ভর্তি বই। মানুষের বাসায় এত বই থাকতে পারে উনার বাসা না দেখলে হয়তো জানতেই পারতাম না। অবশ্য ওটাকে বাসা না বলে লাইব্রেরি বললেও খুব একটা ভুল হবে না। যাইহোক, এখন তিনি বড় বড় গুরুগম্বীর বই পড়েন সারাক্ষণ। নগদের উপর উচ্চারণ করতে দাঁত ভেঙ্গে যায় এমন বিদেশি লেখক আর বইয়ের নাম বলে যেতে পারেন। সব নাকি এখনো তার পড়া হয়নি। শুনে আমরা অবাক হই। পড়ার আগেই এই অবস্থা হলে পড়ার পর কী হবে বুঝতে পারি না।
ঢাকা শহরের অলিগলিতে অসংখ্য চায়ের দোকান থাকলেও এই দোকানটা তার বিশেষ পছন্দের। চা আহামরি কিছু না তবু প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা আমরা কজন এখানে এসে বসি। তিনি নানা বিষয়ে কথা বলেন। আমরা মূলত শ্রোতা। তিনি চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। এটা তার দীর্ঘ কথা বলার প্রস্তুতি। একটা কথা বলার পর অনেকক্ষণ বিরতি দিয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে বিরাট একটা লেকচার দেন। সেই লেকচারের সব যে বুঝতে পারি তা নয়। তবে তিনি কথা বলেন বেশ। শুনলে শুনে যেতেই ইচ্ছা করে।
আফজাল ভাই বললেন, ‘গবেট বলেই একের পর এক বিদেশিরা এসে আমাদের শাসন শোষণ করে গেছে। আর আমরা বসে বসে শোষিত হয়েছি।’
বুঝলাম আজকের কথাবার্তা অন্যদিনের চাইতেও উচ্চমার্গীয় হবে। কথা কোন দিক থেকে কোথায় যে যাবে সেটা ঠাওর করতে পারলাম না। আফজাল ভাই বলে চললেন, ‘বিদেশিদের শাসনের ফলে আমাদের একটা বড় অংশের মনে ধ্যান ধারণা হয়ে গেছে বিদেশি মানেই প্রভু। বিদেশ মানেই স্বর্গ। কাজেই বিদেশিরা যখন বিদেয় হলো আর আমরা নিজেরা যখন ক্ষমতায় বসলাম তখন আমরা নিজেরাই নিজেদের শাসন শোষণ শুরু করলাম। এরপর নিজের দেশ থেকে চুরি করে স্বর্গে অর্থাৎ বিদেশে নিজেদের জন্য বাড়িঘর বানালাম। আগে বিদেশিরা এদেশের সম্পদ নিয়ে যেতো, এখন আমরাই ওদের কাছে দিয়ে আসছি। দেশটাকে বসবাসের অযোগ্য বানিয়ে বসে রয়েছি। সামান্য একটা মৌলিক অধিকার পাওয়ার জন্য কি পরিমাণ সংগ্রাম করতে হয় জানিস?’
বেশ জ্বালাময়ী একটা বক্তৃতা হলো। শুনতে আমাদের বেশ লাগছিল কিন্তু শেষের প্রশ্নটাই দিলো সব মজা মাটি করে। এখনই টিচারদের মতো প্রশ্ন আসবে ‘মৌলিক অধিকার কয়টি ও কী কী বলতো তোরা’। বলতে না বলতেই প্রশ্ন হাজির আর করেছে তো করেছে, আমাকেই করেছে। এত মানুষ থাকতে আমাকে কেন করতে হলো? আমি মৌলিক অধিকারের কি জানি? ওই যে ক্লাস নাইনের ফার্স্টবয়টা বসে রয়েছে, ওকে জিজ্ঞেস করলে কি হয়?
মৌলিক অধিকার কয়টা সেটা যে জানি না এটা বলা যাবে না। প্রেস্টিজের ব্যাপার। এত জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় এসে মৌলিক অধিকারের মতো মৌলিক বিষয় না জানাটা সত্যিই প্রেস্টিজের ব্যাপার।
বললাম, ‘ছয়টা।’
‘কী কী?’
‘নাক, কান…’
একটা হাসির রো পড়লো। আফজাল ভাই অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। পঞ্চইন্দ্রিয়র কথা শুনেছি। পঞ্চ মানে তো পাঁচ। ছয় বলে একটা বেশি ফেলেছি বোধহয়।
ক্লাস নাইনের ফার্স্টবয় মহা উৎসাহে এক নিশ্বাসে ‘খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা’ বলে নিরাপত্তা পর্যন্ত বলে ফেললো। আফজাল ভাই গম্ভীর গলায় বললেন, ‘তোকে বলতে বলেছি?’ এরপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মৌলিক অধিকার না পারার জন্য তোর পানিশমেন্ট হচ্ছে আমাদের সবার চায়ের বিল আজকে তুই দিয়ে দিবি।’
ভালো লাগলো না, একদমই ভালো লাগলো না ব্যাপারটা। আজ সকালেই নানু চলে যাওয়ার সময় চকচকে পাঁচশো টাকার একটা নোট দিয়ে গেছে। এখন কি বাজেভাবেই না টাকাটার শ্রাদ্ধ হবে। টাকার দুঃখে আমি মনমরা হয়ে যেতেই আগের চাইতেও পাঁচগুণ উৎসাহ নিয়ে ক্লাস নাইনের ফার্স্টবয় বললো, ‘ভাইয়া আমিও চা খাবো।’
রাগে গা-টা জ্বলে গেল। সেদিনের ছোকরা- শুধু জ্ঞানীগুণী আলোচনা হয় বলে এখানে এসে বসে থাকে আবার বলে কিনা চা খাবে। বললাম, ‘তুই কবে থেকে চা খাস?’
ও কিছু বলার আগেই আফজাল ভাই বললেন, ‘কবে থেকে খায় তা জেনে তুই কি করবি? খেতে চেয়েছে ওকেও খাওয়াবি।’
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। নতুন পাঁচশোটা টাকা। এখন ভাঙানো মাত্রই হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো হাওয়া হয়ে যাবে। মৌলিক অধিকার জানার চাইতে পাঁচশো টাকার মায়া তীব্রতর। কিন্তু কিছুই করার নেই। মাঝেমাঝে এরকম গুরু পাপে লঘু শাস্তি দিলেও আফজাল ভাইকে আমরা সবাই ভীষণ পছন্দ করি। পছন্দ করার অবশ্য অনেক কারণ আছে। যেমন নিজে না খেললেও জন্মদিনে পাওয়া পুরো ব্যাডমিন্টন সেট (নেট সহ) শীতকালে আমাদের দিয়ে দেন খেলার জন্য। পরীক্ষার পর মারদাঙ্গা থ্রিলার আর অ্যাডভেঞ্চারের বইগুলো তার কাছ থেকেই তো আমরা নিয়ে পড়ি।
আফজাল ভাই আবার কথা শুরু করতে গিয়েও করলেন না। বললেন, ‘নাহ, মুডটাই নষ্ট করে দিলি। আজ এই টপিক শেষ। তারচে অন্য একটা গল্প বলি।’
আমরা সবাই ক্লাস নাইনের ফার্স্টবয়ের মতো উৎসাহ নিয়ে বসলাম। জ্ঞানের আলোচনা না হয়ে গল্প হবে বলে ও অবশ্য এবার একটু দমে গেল। আফজাল ভাই সবসময় গল্প বলেন না। কালেভদ্রে তার কাছ থেকে গল্প শোনার সুযোগ পাওয়া যায়। এখন মনে হচ্ছে পাঁচশো টাকাটা বৃথা যাচ্ছে না।
তিনি গল্প শুরু করলেন, ‘গল্পের সত্য মিথ্যা জানি না। ছোটবেলায় গ্রামে গিয়ে শুনেছিলাম। আমাদের গ্রামের গল্প। চেয়ারম্যান নির্বাচনের ভোট হবে। যে চেয়ারম্যান এখন আছেন- মানে তখন ছিলেন তিনি এই নিয়ে তিনবার দাঁড়ালেন। আগের দুইবারই বিপুল ভোটে জিতেছেন কারণ এলাকায় তার প্রচুর দাপট, লোকে তাকে ভয় পায়। তার বিপরীতে যারা দাঁড়ায় তারা ধর দাঁড়ানোর জন্যই দাঁড়ায়। আগেরবার নাকি প্রতিদ্বন্দী তিনটা ভোট পেয়েছিল। তারপর ভোটের পর বাড়ি থেকে সেই যে বেরিয়ে গেলেন আর আসেননি। কারণ যেই বাড়িতে তার সম্মান নেই সেই বাড়িতে তিনি আসবেন না।’
আমরা প্রশ্ন করলাম, ‘কেন? কেন?’
‘বুঝলি না। উনার বাড়িতেই লোক ছিল ছয়জন। আর ভোট পেয়েছেন তিনটা। তারমধ্যে একটা তো অবশ্যই তার নিজের হবে। সে যাইহোক, সেই প্রতাপশালী চেয়ারম্যান স্বাভাবিকভাবেই বিশিষ্ট দুর্নীতিবাজ। ফ্যামিলির সবাই থাকে ঢাকায়। এলাকার কাজের জন্য যত টাকা পাওয়া যায় তার প্রায় সবটাই চলে যায় ঢাকায়। এটা হলো ওপেন সিক্রেট। এবার আমরা মূল গল্পে যাচ্ছি। নির্বাচন তো হবে কিন্তু প্রতিদ্বন্দী পাওয়া যাচ্ছে না। সবার ফ্যামিলি ভাবছে যাকে দাঁড় করানো হবে সেও যদি তিন ভোটওয়ালার মতো বাড়ি ছেড়ে চলে যান। চারদিকে যখন টেনশন- আদৌ কাউকে পাওয়া যাবে নাকি ঠিক তখন আমাদের এই জনগণের সেবককে চ্যালেঞ্জ করে বসলো গ্রামের ছিচকে চোর মতি মিয়া।’
আমরা অবাক হয়ে বললাম, ‘বলেন কি?’
‘এক্স্যাক্টলি। গ্রামের সবাইও ঠিক এরকম অবাকই হয়েছিল। সাহস দেখে কেউ কেউ অবশ্য তারিফও করেছিল। লোকটা মাইকিং শুরু করলো, “আমি চোর এইটা আপনেরা সবাই জানেন। কিন্তু সেও তো চোর। সে মিথ্যা বইলা চুরি করে। আমি সত্য বইলা চুরি করতে আসতেছি। এখন আপনেরা সত্যরে জিতাবেন না মিথ্যারে জিতাবেন সেইটা আপনেগো বিবেচনা।”
আমরা সবাই একসঙ্গে প্রশ্ন করলাম, ‘তারপর? চোরটা কি জিতেছিল?’
আফজাল ভাই বললেন, ‘চোর তো দুইজনই। কোন চোরের কথা বলছিস?’
আমরা থতমত খেয়ে গেলাম। বললাম, ‘ছোট চোর। ছোট চোর।’
আফজাল ভাই উত্তর দিলেন না। বললেন, ‘তোদের কি মনে হয়? কে জিতেছিল? আর কে জিতলে ভালো হতো?’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You May Also Like

ইস্টিশন

ইমা কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছালো দৌড়াতে দৌড়াতে। ট্রেন ছাড়ার কথা দুপুর একটায়। এখন বাজে দুইটা সাত। সকাল থেকে একটু…
Read More

মেঘফুল

বাইরে রোদ ঝলমল করছে। অথচ আজ সারাটা দিন সূর্য ছিল মেঘের আড়ালে। সেই ভোরবেলায় বৃষ্টি নামার পর আর…
Read More

আবদ্ধ

সময় এগিয়ে যায়। বেলা বাড়ে। কৃত্রিম যান্ত্রিকতা চাপিয়ে নিজেদের ঠিকানা খুঁজে নিতে বের হয় কোলাহল। ভোরবেলার নিস্তব্ধতায় ছেয়ে…
Read More