দামাল: ইতিহাসের জার্সি গায়ে গল্পের হোঁচট

0 Shares
0
0
0

ফুটবলের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ব্লেন্ডিংটা পরিচালক কেমন দেখালেন সেটাই দেখার জন্য দেখতে এসেছি ‘দামাল’। কিন্তু একি! স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের কাহিনী কোথায়? এ তো নারী ফুটবল দলের খেলা দেখাচ্ছে। জাপানের সঙ্গে খেলা, একটার পর একটা গোল খেয়েই যাচ্ছে। বুঝলাম পরিচালক ফ্ল্যাশব্যাকে একাত্তরের গল্প বলবেন। খুব ভালো। কিন্তু আমার বিরক্ত লাগলো।

ইন্ট্রোতে একটা সিন শেষ হয় আর ফেড আউট হয়। জিনিসটা পরিচালকের আগের সিনেমা ‘নিঃশ্বাস’ এর বারবার টাইমলাইন চেঞ্জ করার মতোই বড়ই বিরক্তিকর। এই ফেড ইন আর ফেড আউট দেখতে দেখতে দেখতে যখন ধৈর্যচ্যুতি হবে তখন মূল গল্প শুরু হয়। পরিচালক গতানুগতিক ধারায় না গিয়ে নারী ফুটবল দল নিয়ে এসেছেন এই ব্যাপারটা ভালো। তবে এই অ্যাপ্রোচ ব্যক্তিগতভাবে আমার ভালো লাগেনি। আর তাছাড়া সিনগুলো বড্ড ফাস্ট চলে গেছে। সেই সাথে পরাণ, নিঃস্বাসের মতো রায়হান রাফির ডাবিং না মেলার সিগনেচার স্টাইলটা এই মুভিতেও বিরাজমান।

গল্পটা বাস্তব কাহিনী থেকে অনুপ্রাণিত। তবে মুভিটা বাস্তবতা বহির্ভূত। সে আলোচনায় একটু পরে আসছি। সেট ডিজাইন ভালো আর কালারের জন্য একাত্তরের সময়টা ভালোভাবে ফুটে উঠলেও শুটিং যে সেটে করা হয়েছে এটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিলো। যাইহোক, এই সেট আর শরিফুল রাজ ছাড়া আর কোনকিছু ঠিক একাত্তরের বলে মনে হয়নি। শরিফুল রাজ যথারীতি এই চরিত্রের সাথেও মিশে গেছেন। তার লুক আর অভিনয় দুইটাই মুগ্ধতা ছড়িয়েছে। তবে হতাশ করেছেন সিয়াম। তার চেষ্টা প্রশংসনীয় কিন্তু তাকে দেখে মনেই হয়নি সময়টা মুক্তিযুদ্ধের। সিনেমাটার টোনের সঙ্গে তার কৃত্রিম অভিনয় বড্ড বেমানান। আর ম্যানেজারের চরিত্র ইফতেখাব দিনার যথাসম্ভব ফুটিয়ে তুললেও বৃদ্ধ বয়সের লুকে তার মেকআপ সিয়ামের অভিনয়ের মতোই কৃত্রিম লেগেছে। তবে রাজাকার আর পাকিস্তানি মিলিটারির মেজরের চরিত্র দুটি ভারী শক্তিশালী ছিল। সঙ্গে অভিনয়টাও দুজন চমৎকার করেছেন। তবে ডিরেক্টর মেজরের ঠান্ডা চোখের গা হিম করা চাহনি নিয়ে কিছু মোমেন্ট রাখতে পারতেন। এই এক মেজর আর রাজাকার ছাড়া পাকিস্তানি মিলিটারিকে স্রেফ পুতুল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। টিপিক্যাল বাংলা সিনেমার মতো ক্লাইম্যাক্সে সবাইকে তুলে নিয়ে যাওয়াটা বড়ই দুর্বল লেগেছে। যদিও মেজর আর রাজাকার চরিত্রের দুই অভিনেতার জন্য খানিকটা উৎরে গেছে কিন্তু পুরো ব্যাপারটার ভরাডুবি হয় যখন মুক্তিযোদ্ধারা অ্যাটাক করে। এখানে দুইটা বড় সমস্যা। এক, পাকিস্তানি মিলিটারিকে কি সহজে হারিয়ে দিলো! আর দুই, কীভাবে হারালো সেটাও ভালো করে দেখালো না।

পাকিস্তানি মিলিটারিকে দুর্বল শুধু ক্লাইম্যাক্সেই দেখানো হয় নাই। একটা সিন আমি মুভি দেখার সময়ও বুঝি নাই, এখনো বুঝি না। আমার ধারণা শুধু হিরোকে প্রেজেন্ট করার জন্য সিনটা রাখা হয়েছিল। সিনের বিষয়বস্তু হচ্ছে, পাকিস্তানি মিলিটারির ক্যাম্পে অ্যাটাক করে মুক্তিযোদ্ধারা দখল করে নেবেন। কিন্তু আমরা পর্দায় দেখি আমাদের হিরো সিয়াম বীরদর্পে ফাকা গুলি করে যাচ্ছে, মৃত লাশকে গুলি করে আবার মারছে। দুই একজন জীবিত মিলিটারি ছিল বটে, তবে ওরা না থাকলেও কিছু হতো না। এই সিনের শেষটা সুন্দর। কিন্তু স্ক্রিপ্টে সমস্যা থাকার জন্য ভালোভাবে বিল্ড করতে না পারার কারণে আমরা অসাধারণ একটা মুহূর্ত পেতে গিয়েও পেলাম না।

এই অসাধারণ মুহূর্ত এই একটা সিনে পেতে গিয়ে পেলাম না এমন না। পুরো মুভিটার সামারিই এটা। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এক্ষেত্রে অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছে। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এক কথায় বেশিরভাগ সিনে মিস প্লেসমেন্ট হয়েছে। দেখতে বিরক্তিকর লেগেছে। তবে এই ছবির সিনেমাটোগ্রাফি দারুণ মুগ্ধতা ছড়িয়েছে। অসাধারণ কিছু শট সিনেমায় রাখা হয়েছে যেগুলো বড় পর্দায় দেখতে বেশ ভালো লেগেছে।

ট্রেইলারের শেষে যেই কোপাকুপির সিনটা দেখায় সেটা এই ক্লাইম্যাক্সেই আছে। কোপাকুপির পর পুরো ব্যাপারটা আরো intense করতে একটা টপ ওয়াইড শট রাখলে ব্যাপারটা দারুণ হতো। এই সিন থেকে যেভাবে ট্রানজিশন হলো সেটা পুরো মুহূর্তকেই মাটি করে দিয়েছে।

এই সিনেমার রানটাইম আরেকটু বেশি হওয়া প্রয়োজন ছিল। ফুটবলার বলতে পুরো সিনেমায় তিনজনকে হাইলাইট করা হয়েছে যাদের দুইজনই মেইন হিরো। বাকিরা মাঠে এবং সিনেমায় না থাকলেও কোন সমস্যা ছিল না। একটা অসাধারণ সিনেমা বানানোর সুযোগ পরিচালকের কাছে ছিল। সিনেমার কথা বাদ দেই। অন্তত ইমোশনাল সিনগুলো দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলার সব রসদই ছিল। কিন্তু পরিচালক প্রত্যেকবার হতাশ করেছেন। দেড় ঘন্টার একটা সিনেমায় প্রেম, ফুটবল, দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধের নির্মমতা, যুদ্ধে সবার অবদান, দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার যন্ত্রণা, স্বাধীন দেশের নারী ফুটবলারদের সমস্যা, তাদের বিজয় ইত্যাদি দেখাতে গিয়ে কোনকিছুই গভীরভাবে অনুভব করাতে পারেননি।

সিনেমার পুরো গল্পটাই বলা হয়েছে বর্তমান নারী ফুটবল দলের খেলোয়াড়দের যারা নানান সমস্যায় আর খেলতে চাচ্ছে না। সচরাচর এই ব্যাপারটা আমরা কোন নাটক সিনেমায় দেখি না কিন্তু পরিচালক এই দিকটা তুলে ধরেছেন বলে তার প্রশংসা প্রাপ্য। কিন্তু নারী ফুটবল দলের সদস্যদের অভিনয় আমার কাছে অতি-অভিনয় মনে হয়েছে।

সিনেমার শেষের পুরো ব্যাপারটাকে এক কথায় জগাখিচুড়ি বলাই যায়। একাত্তরের স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের গল্প শুনে আমাদের বর্তমান প্রজন্মের নারী ফুটবল দলের সদস্যরা এতই অনুপ্রাণিত হলেন যে একটার পর একটা ম্যাচ জিতেই চলেছেন। সেখানেই আমার আপত্তি। আপত্তিটা জয় দেখানোর জন্য না, বরং ফিকশনাল ক্যারেকটারগুলো কীভাবে বাস্তব ফুটবল দলের সদস্য হয়ে গেলো সেটা ঠিক বুঝতে পারলাম না। এখানে শুধু ফিকশনাল ক্যারেকটারগুলোর সাকসেস দেখানো যেতো অথবা ঐতিহাসিক ছবি বা ভিডিও দেখানোর অংশ হিসেবে বাস্তব ছবি/ভিডিও দেখানো যেতে পারতো। সিনেমার মধ্যেও যখন প্রথমবার পতাকা নিয়ে মাঠে নামে ঠিক তখনই কেন আসল ছবিটা আধা সেকেন্ডের জন্য পর্দায় দেখাতে হবে! সিনেমাটা শেষ হওয়া পর্যন্ত রেখে দেয়া তো যেতো! আবার এই ভিডিও দেখানো শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টাইটেল ট্র্যাক- সেখানে টাইমলাইনে গন্ডগোল করে মূল চরিত্ররা স্পন্সরের লোগো সম্বলিত জামা পরে নাচানাচি করছে! গানটা মুক্তির পর ভেবেছিলাম এটা সিনেমায় থাকবে না। সত্যি সত্যি না রাখলেও অবশ্য কিছু আসতো যেতো না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You May Also Like