‘ভাইয়া আপনি একা না? আমরা তিনজন আসলে একসাথে। আপনি কি কাইন্ডলি পাশের সিটে বসতে পারবেন?’
সিনেপ্লেক্সের টিকেট বিক্রি শুরু হবার ঘন্টাখানেকের মধ্যে বিকালের শো এর প্রায় সব সিট বুকড। সকালের শোতে দেখলাম পছন্দের সারি তখনো ফাঁকা। ছুটির দিন সকালে উঠে সিনেমা দেখতে যাবো নাকি আরাম করে ঘুমিয়ে কোনার দিকের সিটে বসবো সেটা ভাবতে ভাবতে এগারোটার টিকেট কেটে ফেললাম।
ঈদের ছুটি। রাস্তাঘাট ফাঁকা, দোকানপাট সব বন্ধ। হাউজফুল বলে সাতসকালে বের হলাম তুফান দেখতে। এর আগে ‘জাওয়ান’ এর সময় দেখেছি হাউজফুল থাকলে অনলাইনের টিকেট কালেক্ট করতে বেশ বড় লাইনে দাঁড়াতে হয়। তাই এবার আগেভাগে চলে এসেছি।
হলে পৌছালাম শো শুরুর ঘন্টাখানেক আগে। বেশি আগে চলে এসেছি। কাউন্টার এখনো খোলেনি। নিয়ে দশ মিনিট বাদে টিকেট নিয়ে ঢুকতে গিয়ে শুনি আরো বিশ মিনিট পর যেতে হবে। বিশ মিনিট পর তাকিয়ে দেখি হলে ঢোকার জন্য লাইন শুরু হয়ে গিয়েছে। বেশ লম্বা লাইন পার হয়ে হলে ঢুকলাম। হলভর্তি মানুষ। দলবল সহ বন্ধুবান্ধব, বয়স্ক এক দম্পতি, বাচ্চাকে নিয়ে বাবা মা- অনেককে চোখে পড়লো।
দর্শকের চাপা উত্তেজনা বাড়িয়ে সিনেমা শুরু হলো। ইন্ট্রো সিন দেখেই মনে হলো আমার টিকেটের টাকা উশুল। এরকম ইন্ট্রো কখনো কোন বাংলা সিনেমায় দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তুফান এ নিয়ে আমার হলে দেখা শাকিব খানের দ্বিতীয় সিনেমা। এর আগে ‘শিকারি’ দেখেছিলাম। নতুনভাবে শাকিব খানকে দেখানো প্রথম সিনেমা বললেও খুব একটা ভুল বলা হবে না। তবে সেবার তিনি হতাশ করে তার সেই ভার্সনটা বেশিদিন ধরে রাখতে পারেননি। প্রিয়তমা থেকে এবার যেভাবে তিনি একের পর এক সিনেমা নিয়ে আসছেন তাতে আমি বেশ আশাবাদী তিনি তার এই ভার্সনটা ধরে রাখবেন এবং এরপর আরো একধাপ উপরে নিয়ে যাবেন।
এর আগে রায়হান রাফির ‘দামাল’ হলে দেখেছিলাম। সেখান থেকে এই সিনেমায় তার পরিচালনার উন্নতির গ্রাফটা লক্ষণীয়। ‘সুড়ঙ্গ’ থেকে তার ‘সিগনেচার’ টেকনিক্যাল এরর (যেমন ডাবিং না মেলা) চলে যেতে শুরু করেছে। এই সিনেমাতেও সেই ধারা অব্যাহত ছিল। সুড়ঙ্গের সঙ্গে সেট ডিজাইন, ক্যামেরা আর কালারের স্টাইলের একটা অদ্ভুত মিল আছে যেটা দেখে মনে হলো পরিচালক তার ‘সিগনেচার স্টাইলটা’ বদলাচ্ছেন।
রায়হান রাফি তার প্রতিটা ছবিতেই নিজের সেরাটা দিয়ে থাকেন। সেই সেরাকে সর্বোচ্চ নিয়ে যেতে চেষ্টা করেন পরের ছবিতে। তার বেশ কয়েকটা সিনেমা দেখার পর আমার এই কথাই মনে হচ্ছে। এই ছবিতে পরিচালক তার প্রায় সমস্ত সিগনেচার স্টাইল নিয়ে এসেছেন আরো বড় স্কেলে, নতুন আঙ্গিকে।
প্রথম যখন শুনেছিলাম রায়হান রাফি আর শাকিব খান একসঙ্গে সিনেমা করবেন তখন ভালোই লেগেছিল। তবে যখন শুনলাম সেই সিনেমার নাম ‘প্রেমিক’ তখন যারপরনাই হতাশ হয়েছিলাম। খুব ভালো লাগলো সেটা বাদ দিয়ে তুফানের মতো একটা সিনেমা বানানোয়। দুই বাংলার তিনটা বড় বড় প্রতিষ্ঠান এবং দেশের সবচেয়ে বড় স্টার আর সুড়ঙ্গের মতো সিনেমা বানানো পরিচালক মিলে যেই সিনেমা দরকার ছিল ঠিক সেটাই বানালেন।
এটা ঠিক পুরোপুরি শাকিব খানের সিনেমা না। আবার এই সিনেমায় শাকিব খানই হচ্ছে নিউক্লিয়াস। তাকে ঘিরেই সকল ঘটনা। বড় পরিচালক আর বড় নায়ক ঠিকমতো একসাথে হতে পারলে ঠিক এই ব্যাপারটাই ঘটে। এই মুহুর্তে এমন একটা সিনেমার কথা মনে পড়ছে ‘জাওয়ান’।
শাকিব খানকে আমাদের এফডিসির রসগোল্লা বানানো পরিচালকেরা ঠিকমতো ব্যবহার করতে না পারলেও উনি যে গুণী একজন অভিনেতা তার প্রমাণ এর আগে অনেক সিনেমাতেই তিনি দিয়েছেন। তাই এই ছবিতে তার অভিনয় এক্সপ্রেশন- মোদ্দা কথা পারফরম্যান্স তার ক্যারিয়ারের সেরা কিনা সেটা নিয়ে তর্ক হতে পারে। তবে এই সিনেমায় তিনি যেই চরিত্র করেছেন, যে অভিনয় করেছেন, যেই এক্সপ্রেশন তিনি দিয়েছেন- এমনটা তার ক্যারিয়ারে তিনি কখনো করেননি এ কথা নিশ্চিত হয়েই বলা যায়।
এসব সিনেমায় গল্পটা আহামরি কিছু থাকে না। তবে এটা যেহেতু প্রথম পার্ট এবং অনেকটা ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং, ক্যারেক্টার ইন্ট্রোডাকশনের ফাউন্ডেশন গল্প, যেমনটা রায়হান রাফি বলেছেন “তুফান-ওয়ান জাস্ট ট্রেইলার, ‘টু’ হলো আসল সিনেমা” সে হিসেবে এই ছবির গল্পকে ঠিকঠাক বলা চলে। গল্প উতরে না গেলে এই লুক এন্ড ফিল আর প্রেজেন্টেশন মাঠে মারা পড়তো।
তবে এই সিনেমার প্রাণ হচ্ছে এর ডায়লগ। একেকটা ডায়লগ হচ্ছে একেকটা (মমতাজের ভাষায়) আগুনের গোলা। স্রেফ অসাধারণ আর বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপের জন্য শাকিব খান, চঞ্চল চৌধুরী আর গাজী রাকায়েতের তিনটা চরিত্র পুরোপুরি অন্য লেভেলে চলে গেছে। [সেকেন্ড পার্টে ‘আমি নায়ক, আমিই দানব’ টাইপ কোন ডায়লগ থাকা ভীষণ দরকার।]
সিনেমাটোগ্রাফি আর মিউজিক চোখ আর কানের শান্তি। রায়হান রাফির একটা সিগনেচার হচ্ছে ওয়ান টেক। এই সিনেমার ওয়ান টেক দেখে আমি মুগ্ধ। সেট ডিজাইন, সিনেমাটোগ্রাফি আর এক্সিকিউশন- শাকিব খানকে কখনো এমন সিনে ওয়ান টেকে দেখবো এটা ভুলেও ভাবিনি।
খুব অল্প কিছু সময়ের জন্য পর্দায় আসা চরিত্রদের জন্যেও দেশের গুণী অভিনেতাদের হাজির করেছেন পরিচালক। ব্যাপারটা আলাদা কিছু না করেও সিনেমার স্কেল বাড়িয়েছে, চমক যোগ করেছে। অবশ্য এই ছবিতে সেই পোস্টার থেকে শুরু করে চমক ছাড়া আর আছেই বা কি!
তুফান অবশ্যই বাংলা সিনেমার ইতিহাসের সেরা সিনেমা না। খুব পারফেক্ট সিনেমাও না। তবে তাতে কিছু যায় আসে না। সিনেমাটা নিশ্বাস আটকে পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকার মুহুর্ত তৈরী করতে পেরেছে। পুরো হল হাততালি আর উল্লাসে ফেটে পড়ছে এমন মুহুর্ত তৈরী করতে পেরেছে। দর্শকদের এমন কিছু দেখাতে পেরেছে যা তারা কল্পনাও করতে পারেনি। এর চাইতে সিনেমার সবচেয়ে বড় সফলতা আর কি হতে পারে?